প্রবাসে মৃত্যু; এ কী মনুষ্য মৃত্যু!

0

বিয়ানীবাজার ভিউ২৪ ডটকম, ১১ মার্চ ২০১৮,

কবি আবরার শাহরিয়ার এর ‘মৃত্যু প্রতীক্ষা’ শিরোনামের কবিতায় তিনি লিখেছেন-

“যে পথে আমার মৃত্যু

আমি সেই পথে একবার-

বার বার, বহুবার ফিরে যাই!

আমার মৃত্যুতে কারো শোক

কিংবা জান্তব উল্লাস নেই!”

আমরা যেমন জন্ম নিয়েছি, তেমনি একটা সময় মরেও যাব ৷ আচ্ছা, একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো, আপনার মৃতদেহ পরিচয়হীন হাসপাতালে পরে আছে, আপনার মৃতদেহ মৃত্যুর চার-পাঁচ দিন পরে স্বজনের কাছে গেছে, এমনটাও ভাবতে পারেন আপনার মৃতদেহ কোন দিনই পৌঁছাল না স্বজনদের কাছে! এমন মৃত্যু কে কী বলবেন? বলছি, প্রবাসে মৃত্যু হওয়া প্রবাসী মানুষদের কথা ৷

সম্প্রতি, এক তথ্য বলছে, প্রবাসে বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সরকারি হিসেবে,

প্রতিদিন দেশে আসছে অন্তত ১০ প্রবাসী শ্রমিকের লাশ।

সংশ্লিষ্ট দেশের পক্ষ থেকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক কিংবা দুর্ঘটনা বলা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রকৃত কারণ অজানা থেকে যায়।

দেশের তিনটি বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন অভিবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের লাশ দেশে আসে। সরকারি পরিসংখ্যান মতে, ২০০৫ সালে ১ হাজার ২৪৮টি লাশ দেশে আসলেও, ২০০৯ সালে এই সংখ্যা দ্বিগুণ এবং বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় তিনগুণ। গত এক যুগে প্রবাসী কর্মীর লাশ আসার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৪৬৭ তে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

সম্প্রতি প্রবাসে মৃত্যুর সংখা ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালে বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ মালয়েশিয়াতেই গেল বছরে ছয় হাজারেরও বেশি প্রবাসীর মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে ৷ এর বড় একটি অংশই কর্মস্থলে বিশেষ করে নির্মাণশিল্পে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে ৷ এছাড়াও অপহরণ হয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে ৷ অসুস্থ হয়ে ও স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর সংখ্যাও নেহাত কম নয় ৷ প্রবাসে মৃত্যু হলে একটি অনুদান পাওয়ার বিধান রয়েছে, কত জন সেই অনুদান পায়। আর অবৈধ থাকা অবস্থায় মৃত্যু হলে তো সে লাশের কপালে ভোগান্তির গ্লানি ছাড়া কিছুই থাকে না!

যেভাবেই মৃত্যু হোক, তা পরিবার পরিজনদের কাছে কখনই সুখকর নয় ৷ কিন্তু প্রবাসে মৃত্যু, এটি যেমন সুখকর নয়, তেমনি শোকের দাগহীন মৃত্যু! জীবনের শেষ মুহূর্তে নিজ দেশের মাটিতে বা আপন মানুষের মুখ দেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লে তো অন্তত শেষ সময়ের স্বজনের মুখখানি দেখা হয়। শেষ মুহূর্তে তো স্বজনদের প্রিয় মুখগুলো মনে পড়াটা স্বাভাবিক। ভাবুন তো সেসময় একা একা কোন এক চিলেকোঠায় বা অপ্রত্যাশিত কোন জায়গায় মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া কতটা কষ্টের!

এখানেই শেষ না, মরে যাওয়ার পরও শান্তি পায় না নিহতের লাশ। কোন কোন লাশ দেশে পৌঁছাতে পৌঁছাতে স্বজনের চোখের পানি শুকিয়ে যায়, শোক হয়ে উঠে বিবর্ণ ৷ প্রবাসীর লাশ স্বজনের কাছে পাঠাতে দেশ বিদেশের একগাদা নিয়ম সম্পন্ন করতে করতে লাশ আর লাশ থাকে না। তাতে পচন ধরে যায়, দুর্গন্ধ ছড়ায় চার পাশে। এমনও হয়, অনেক লাশের পরিচয়ও চিশ্চিৎ হওয়া যায় না ৷ তখন মৃত ব্যক্তির সেই লাশটি তার আপনজনদের স্পর্শ টুকুও পায় না ৷

সকল প্রবাসীর দেশে ফিরা নিয়ে কিছু স্বপ্ন থাকে ৷ এই যেমন: মায়ের হাতের রান্না খাওয়া, স্ত্রী সন্তানের সাথে মধুর সময় কাটানো, গ্রামের চির চেনা পথে হেটে প্রশান্তির নিশ্বাস নেয়া, বিয়ে করে সংসার করার স্বপ্ন, সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানকে বুকে নিয়ে শান্তি পাওয়ার স্বপ্ন ৷ তেমনি দেশে থাকা স্বজনদেরও চোখ জুড়ে স্বপ্ন থাকে প্রবাসে থাকা প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে ৷ এমনও তো হয়, প্রেমিকা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তার ভালবাসার মানুষের অপেক্ষাতে দিন গুণতে থাকে ৷ কিন্তু একটা সময় দূর প্রবাসে সত্য রুপকথা ভেদ করে বিরহের ঢোল বাজিয়ে মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়ায় কারো কারো! তারপরও সবার্ কাম্য স্বদেশেই যেন প্রবাসী নামে খ্যাত ব্যক্তির সমাধি ৷

স্রষ্টার সমীপে পার্থনা করি, প্রত্যেক মানুষকেই সুন্দর মৃত্যু দাও ৷ স্বদেশেই যেন হয় প্রতিটি প্রবাসীর সমাধি!

Ads:

Share.

Leave a Reply