”বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গাড়ি চলছে, তবে ক্ষনে ক্ষনেই আটকে যাচ্ছে” – ফরহাদ আহমদ

0

রিপোর্ট : বিয়ানীবাজার ভিউ ২৪ ডেস্ক,  ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫,

শাহ আব্দুল করিমের গাড়ি চলে না, চলে না গানটি শুনেন নি এমন মানুষ খুজে পাওয়া যাবে না। এই অতিমাত্রায় প্রতিভাবান ব্যক্তি তার এ গানে বলেছেন দেহ তত্ত্বের কথা। কিন্তু দেখুন না, গানের প্রথম কয়েকটি কথা কত সুন্দর ভাবে ফিট করে যায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এ গাড়ি চলছে, তবে ক্ষনে ক্ষনেই আটকে যাচ্ছে।

মাধ্যমিক পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা গ্রহন করবে বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু। এ কথা আমি বলছি না, বলছে আমাদের দেশের সংবিধান। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে বিনামূল্যে শিক্ষা লাভের কথা। কিন্তু বাস্তবতাটা কেমন তা আজ আমরা সবাই জানি। সংবিধান রচনার ৪৩ বছর পরও আমরা এই ১৭ নাম্বার অনুচ্ছেদের যথার্থ প্রয়োগ করতে পারিনি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা ব্যবস্থা গুলোর মধ্যে একটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৩৭,৬৭২ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে বাংলাদেশে। যেখানে শিক্ষা গ্রহন করছে প্রায় ১০.৭ মিলিয়ন শিক্ষার্থী। এই দুইটি কথা শুনেই তৃপ্ত হলে ভুল করবেন। কারণ এরপরই আপনাকে আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করতে হবে, এর মধ্যে ৬,৩০০ টি বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী একটি দেশে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর অনুপাত হচ্ছে ৩০:১। অর্থাৎ প্রতি ত্রিশ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রদান করবেন একজন শিক্ষক। কিন্তু আমাদের দেশ এ নীতিতে চলে না। এখানে প্রতি ৫৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র এক জন শিক্ষক। আর শিক্ষার মানের সম্পর্কে আশা করি আপনাদের আর অবগত করতে হবে না। পর্যাপ্ত বিদ্যালয় এর অভাব তার  সাথে যুক্ত আছে শ্রেণীকক্ষের অপর্যাপ্ততা। লাইব্রেরী আর খেলার মাঠের চিন্তা করা তো চরম দুর্ভিক্ষে ডাল ভাতের বদলে বিরিয়ানি আশা করার মত।

বিশ্ব ব্যাংক এর ‘বাংলাদেশ এডুকেশন সেক্টর রিভিউ’ নামক রিপোর্টটি পড়লে আরো আশ্চর্য হতে হয়। বিশ্ব ব্যাঙ্কের মতে আমাদের দেশের ৭০ ভাগ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় ত্যাগ করার পরও সঠিক ভাবে লিখতে,পড়তে ও প্রয়োজনীয় ছোট খাট হিসাব নিকাশ করতে পারে না। এই প্রতিবেধনে আরো বলা আছে উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষকদের শিক্ষা দানের কৌশল সম্পর্কে। আর এ কৌশলটি হচ্ছে শ্রেণীকক্ষে এসে লেকচারের নামে পাঠ্যপুস্তক রিডিং পড়ে যাওয়া এবং হাতে গুনা কয়েকটি বিষয় শিক্ষার্থীদের মুখস্ত করতে দেয়া। নতুন কোন কৌশল তারা প্রয়োগ করতে নারাজ। যার প্রধান কারণ নিজেদের অযোগ্যতা এবং পাবলিক পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ হলে বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুন্ন হবে এই ভয়। এই দিক ভ্রষ্ট শিক্ষা দানের কৌশলে হয়তো পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ হচ্ছে কিন্তু শিক্ষার্থীরা সঠিক যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। যার দায়ভার কোন না কোন ভাবে এই শিক্ষা ব্যবস্থারই।

কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা তো আরো ভয়াবহ। প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি বাজারের চাহিদার সাথে মোটেও খাপ খাচ্ছে না। যেখানে উন্নত বিশ্বে দেয়া  হচ্ছে হাতে কলমে শিক্ষা সেখানে আমরা থিয়োরি নিয়ে পড়ে আছি। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে যোগ দিচ্ছে আর আবিষ্কার করছে তাদের যা পড়ানো হয়েছিল তা আসলে সম্পূর্ণ বাওতা। তাদের বইয়ের সাথে কর্মক্ষেত্রের জটিল বিষয় গুলোর কোন মিল নেই।  এক হিসাবে দেখা গেছে ২০১৩ সালে ১০,০২,৪৯৬ জন এইচ,এস,সি পরীক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে ৭৪৪,৮৯১ জন। যার মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ শিক্ষার্থী উচ্চতর পড়ালেখার জন্য বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অথবা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ভর্তি হতে পেরেছে। বাকিরা হয় কোন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে অথবা ঝড়ে পড়েছে। তার মানে হচ্ছে আমরা ১২ বছর কিছু ছেলে মেয়েকে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখাচ্ছি আর তাদেরকে দারপ্রান্তে এনে মুখের উপর বলছি, ‘দুঃখিত, আমরা আর পারছি না। তোমার পড়ালেখা বন্ধ’।

দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে। আর বিদ্যমান এই বেকারত্বের সাথে প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে আরো প্রায় ১,৮ মিলিয়ন কর্মহীন লোক। ২০১৫ তে দেশে আনুমানিক ৩০ মিলিয়ন কর্মহীন মানুষ রয়েছে। যার দায়ভার কিছুটা হলেও এই ধুকতে থাকা শিক্ষা ব্যবস্থার। জাতিসংঘ তার প্রতিটি সদস্য দেশকেই শিক্ষা খাতে নিজস্ব জিডিপির কমপক্ষে ৬ ভাগ ব্যয় করার উপদেশ দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ তার জিডিপির মাত্র ৩ ভাগ ব্যয় করে শিক্ষা খাতে। যেখানে দক্ষিন এশিয়ার অন্যান্য দেশের বাজেটে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয় সেখানে আমাদের দেশে গুরুত্বের দিক দিয়ে শিক্ষার অবস্থান তিনে। উন্নত জাতি গঠনের লক্ষে একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন অবকাঠামোগত পরিবর্তন, শিক্ষকদের সঠিক প্রশিক্ষন এবং যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ অর্থাৎ শিক্ষক নিয়োগে সচ্ছ্বতা।

সুদৃঢ় শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত করা ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন করা, এসব আশা যেন গাছে কাঁঠাল দেখেই গুফে তেল দেয়ার সামিল। তাই আশা করব মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তার সুচিন্তিত এবং সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে শিক্ষার এ গাড়িটিকে চলতে সহায়তা করবেন, যেন আর কোন শিক্ষার্থীকে ঝরে পড়তে না। প্রতিটি শিক্ষার্থীই যেন এক একটি পিকাসো হয়ে দরিদ্র এ দেশকে উন্নতির রঙে রাঙাতে পারে।

Share.

Leave a Reply