বিশেষ প্রতিবেদনমতামত

দুর্নীতি, ধর্ষণ, গুম খুনের দেশে ভালবাসাটাই কেবল অপরাধ!







আমিনুল ইসলাম:
আমি বুঝতে পারছিলাম মেয়েটা আমাকে পছন্দ করে। পছন্দ না, বোধকরি ভালো’ই বাসে।
নানান দেশ আর সমাজের মানুষজনদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে অন্তত একটা বিষয় শিখেছি- উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু, পৃথিবীর সকল প্রান্তে ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা এক। বলতে সঙ্কোচ নেই, এই মাঝ বয়েসে এসে ভালোবাসা পেতে খারাপ লাগার কথা না। আমার ভালো’ই লাগে।
আমি নিজেকে জাহির করার জন্য বলছি না। এই লেখার উদ্দেশ্য অবশ্য’ই নিজেকে জাহির করা নয়। বরং পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার জন্য নিজের অভিজ্ঞতা কিংবা ভাবনা গুলো ভাগাভাগি করা।



বলতে’ই হচ্ছে, আমি বেশ ভাগ্যবান। অনেক মানুষ এই বয়েসে এসেও আমাকে পছন্দ করে। তাদের ভালো লাগা, ভালোবাসার কথা জানায়। আমার এতে ভালো’ই লাগে। তবে ব্যাপারটা ভালো লাগা পর্যন্ত’ই হয়তো। বলছিলাম এই মেয়েটির কথা। মেয়েটি কিন্তু আমাকে তার ভালো লাগা কিংবা ভালোবাসার কথা প্রথমে জানায়নি। তার অনেক গুলো টেক্সট কিংবা মেসেজ পেয়ে এরপর আমি গত পরশু তাকে লিখেছি



-আমার ধারণা আপনি আমাকে পছন্দ করেন। আপনি কিন্তু নির্দ্বিধায় আপনার ভালো লাগার কথা প্রকাশ করতে পারেন।
মেয়েটা এরপর আমাকে দুটো বিশাল টেক্সট লিখেছে। যার মুল কথা- ভালোবাসি।
কার না ভালো লাগার কথা “ভালোবাসি” শব্দ’টা শুনতে। অন্তত আমার তো বেশ লেগেছে।
মেয়েটাকে আমি সেই অর্থে চিনি না। খানিক চেনা জানার চেষ্টা করলাম। বেশ চমৎকার মানুষ’ই তো মনে হচ্ছে। গান গাইতে পারে, হারমোনিয়াম, গীটার থেকে শুরু করে অনেক বাদ্য যন্ত্র বাজাতে পারে, ভালো জায়গা থেকে পড়াশুনা, সব মিলিয়ে বেশ।



এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমি কি তাকে ভালবাসতে যাবো? “হ্যাঁ”, “না” কোন উত্তর’ই আমি এখানে লিখবো না। কারন এই লেখার উদ্দেশ্য সেটা না। প্রশ্ন হচ্ছে- তাহলে আমি কেন নিজ থেকে তাকে বললাম- আপনি মনে হয় আমাকে পছন্দ করেন। যদি করেন, তাহলে সেটা প্রকাশ করাই ভালো।
কারন আমি জীবন ভর বিশ্বাস করে এসছি পৃথিবীর যে কেউ, যা কাউকে ভালোবাসার অধিকার রাখে, সেই ভালোবাসা প্রকাশ করার অধিকার রাখে। সেটা যে কোন ধরনের ভালোবাসা হতে পারে। সেই ভালোবাসা হয়তো অনেকের কাছে অদ্ভুত মনে হতে পারে; কিন্তু আমার কাছে সেটা স্রেফ ভালোবাসা।



ভালোবাসা কিংবা ভালো লাগার এই যে অনুভূতি সেটা অবশ্য’ই অসাধারণ এবং পবিত্র। জগতের সবাই ভালোবাসাতে পারে না। উপরওয়ালা সবাইকে সেই ক্ষমতা দিয়ে পাঠায়নি। যারা ভালবাসতে পারে, যাদের সেই অনুভূতি আছে; সেটা যে কোন ধরনের ভালোবাসা হোক; তাদের অধিকার রয়েছে সেটা প্রকাশ করার এবং প্রকাশ্যে সেই ভালোবাসার কথা বলে বেড়ানোর; দেখিয়ে বেড়ানোর।

সেই ভালোবাসা দুই দিক থেকে পাওয়া যাবে কি যাবে না, সেটা তো পরের ব্যাপার। কেউ একজন অন্য আরেকজনকে ভালবাসলে সেটা প্রকাশ করার সব রকম অধিকার তার থাকার কথা।
আর দুইজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ যদি একজন আরেকজনকে পছন্দ করে, ভালোবাসে; তাহলে তারা সেই ভালোবাসা প্রকাশ করার অধিকার রাখে। অন্তত যে কোন সভ্য সমাজে সেটা’ই হওয়া উচিত।

শুনলাম গতকাল নোয়াখালী এলাকার এক এমপি কিছু ছেলে-মেয়ে’কে ধরে পুলিশে দিয়েছে। শুধু তাই না, যেই ছেলে-মেয়েদের তিনি ধরেছেন, তাদের ছবি তিনি ফেসবুকে আপলোড পর্যন্ত করে দিয়েছেন। তো, এই ছেলে-মেয়েদের অপরাধ কি ছিল?



এরা পার্কে এক সঙ্গে বসে ছিল জোড়ায় জোড়ায়। আমার ধারণা এই এমপি’র সঙ্গে গিয়ে এই বিষয় নিয়ে সরাসরি কথা বলার সামর্থ্য এবং ক্ষমতা দুটো’ই আমার আছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে না তার দরকার আছে। আমি লিখতে পারি। আমার কলম আছে। তাই কলমের আশ্রয় নিলাম।

এমপি মশাই, আপনি কি বলতে চাইছেন ছেলে-মেয়েরা তাহলে ভালোও বাসতে পারবে না?
এই ছেলে-মেয়ে গুলো তো সবাই কলেজে পড়ে। এরা তো পূর্ণ বয়স্ক ছেলে-মেয়ে। এদের তো কেউ জোড় করে পার্কে নিয়ে যায়নি।
এরা যদি কলেজও ফাঁকি দেয়, তাতে আপনার কি?

কলেজ ফাঁকি দিয়ে তারা প্রেম করবে নাকি অন্য কিছু করবে সেটা তাদের ব্যাপার। আপনি তাদেরকে পুলিশে দেবার কে?
আর পুলিশে দিয়েছেন এক কথা, আবার সেই ছবি আপনার ফেসবুকে ফিয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন

-“ছেলে-মেয়েরা প্রকাশ্যে পার্কে এভাবে বসতে পারবে না!”
এই দেশে কি প্রেম-ভালোবাসা নিষিদ্ধ নাকি?
আর এই ছেলে মেয়ে গুলোকে এভাবে সবার সামনে ছোট করার অধিকার কে আপনাকে দিয়েছে?
আপনি তো সেই এমপি, যার ছেলে ঢাকার রাস্তায় মদ খেয়ে গাড়ি চালিয়ে ধাক্কা দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে।
সেই দৃশ্য একজন মটর বাইক চালক দেখেও ফেলেছিল। মানুষ হত্যা করার পর আপনার ছেলে গাড়ি থেকে নেমে ওই প্রত্যক্ষদর্শীকে বলেছিল
-“জানো আমি কে? আমার বাবা এমপি”
তো, আপনার ছেলে প্রকাশ্যে মদ খেয়ে মানুষ হত্যা করে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে; এতে কোন সমস্যা হচ্ছে না।
যত সমস্যা ছেলেমেয়ে গুলো পার্কে বসে ভালবাসলে!

আপনারা মানুষ হত্যা করেন, ধর্ষণ করেন প্রকাশ্যে; কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুট করেন; এরপর বিদেশে গিয়ে মাস্তি করেন মদ খেয়ে, জুয়া খেলে আর উইন্ডো শপিং করে।
আর আমরা পার্কে বসে ভালোবাসলে’ই সমস্যা।
এই দেশে নারী ধর্ষণ করে সেটা ভিডিও করে ছেড়ে দিয়ে মানুষ হিরো হয়ে যায়। আর প্রকাশ্যে দুই জন মানুষ (সেটা হোক ছেলে-মেয়ে, মেয়ে- মেয়ে, ছেলে-ছেলে, বুড়ো-বুড়ি, বুড়ো-জোয়ান, রিকশাওয়ালা-ধনী কিংবা যে কোন ধরনের) ভালোবাসা অপরাধ!

এই দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাতের অন্ধকারে ডেকে নিয়ে মানুষ হত্যা করে নদীতে ফেলে রাখে; সেটা অপরাধ না। আর পার্কে বসে দুই জন মানুষ ভালবাসলে অপরাধ! আপনারা তো মশাই অপরাধের সংজ্ঞাটা’ই পাল্টে ফেলেছেন।

আপনারা যা করবেন, সব পবিত্র। আপনারা ধর্ষণ করলে সেটা হালাল ধর্ষণ, খুব’ই পবিত্র।
আর আমরা দুইজন মানুষ একে-অপরকে পছন্দ করে, ভালোবেসে পার্কে বসে আড্ডা দিলে আপনাদের সহ্য হয় না, পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দেন। অবশ্য পুলিশ যেখানে কাজ করে, সেই থানায় প্রকাশ্যে ধর্ষণ কাণ্ড ঘটলে সেটা অপরাধ না! হালাল ধর্ষণ!

বলছিলাম ওই মেয়েটার কথা। যে তার ভালোবাসার কথা আমাকে জানিয়েছে ঠিক আজ’ই। আমি তাকে নিজ থেকেই বলেছি- তার অনুভূতির কথা যেন সে প্রকাশ করে।

তার অনুভূতি প্রকাশ করার অধিকার যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি যে কারো অধিকার রয়েছে নিজেদের ভালোবাসা পার্কে বসে প্রকাশ করার।
অনেক হয়েছে। এইবার মনে হয় আমাদের সবার’ই উচিত এই নিয়ে সোচ্চার হওয়া।
আপনারা যারা লিখতে পারেন, তাদের উচিত লিখে এই ব্যাপারে মত প্রকাশ করা। আর যারা লিখতে পারেন না, তাদের উচিত আমাদের মতো যারা লিখছে তাদের লেখা গুলো ভাগাভাগি করা। জগতের সকল সভ্য দেশে ভালোবাসা প্রকাশ করা অপরাধ নয়। অপরাধ হচ্ছে খুন করা, ধর্ষণ করা , ব্যাংক লুট করা। আপনারা এইসব করে পার পেয়ে যান, তাই এসব বাড়তেই থাকে। না, আমাদের এসবের দরকার নেই।

আমাদের দরকার একটা মায়াবী ভালবাসাময় সমাজ। যেখানে যে কেউ যে কাউকে ভালবাসতে পারবে। সেই ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে পারবে এবং প্রকাশ্যে পার্কে বসে ভালবাসতে পারবে। যেখানে নেই কোন জোর-জবরদস্তী , আছে স্রেফ দুই জন মানুষের ভালো লাগা, ভালোবাসার জায়গা। আমরা আমাদের ভালোবাসা বহিঃপ্রকাশের অধিকার চাই।
সূত্রঃ এগিয়ে-চলো ডটকম

Related Articles

Close