বিশেষ প্রতিবেদনমতামত

ভারতের চন্দ্র অভিযান ব্যয় ৯৭৮ কোটি, আমাদের বিটিভির বাজেট ১৮৬৮ কোটি







বিটিভি এবার তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট পেয়েছে। বিটিভির আধুনিকায়নের পেছনে রাষ্ট্র ১৮৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বিটিভি নামক চ্যানেল যেখানে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সময়েও ‘বাতাবিলেবুর বাম্পার ফলন’ দেখানো হয় বলে লোকজন কৌতুক করে, সেই বিটিভির পেছনে রাষ্ট্র এতোগুলো টাকা ব্যয় করবে। আমরা এতো বেশি পরিমাণে আজকাল সংখ্যা শুনছি, পরিসংখ্যান দেখছি যে, ১৮৬৮ কোটি টাকার আলাপ শুনতে খুব বেশি আশ্চর্যও লাগে না।

এদেশে এর চেয়ে বড় বড় সংখ্যার টাকা খেলাপি ঋণ হয়ে পড়ে থাকে, ব্যাংক থেকে হাওয়া হয়ে যায়, দুর্নীতি হয়। তাই টাকার অঙ্ক যেমনই হোক, শুনতে খুব একটা অবাক লাগে না।



কিন্তু, আপনি একটু হলেও হয়ত বিস্মিত হবেন জেনে, যখন জানবেন আপনার পাশের প্রতিবেশী দেশ ভারত বিটিভির বাজেট অনুপাতে অর্ধেক বাজেটেই তাদের দেশের এক ইতিহাস রচনা করতে উদ্যোগী হয়েছিল। সেটা হলো চন্দ্র অভিযান। হ্যা, যে চন্দ্র অভিযান সামান্য ব্যবধানে ব্যর্থ হয়েছে বলে আপামর বাঙ্গালি জনতা খুব উৎফুল্ল হয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন, সেই চন্দ্র অভিযানের কথাই বলছি। ভারতের চন্দ্র অভিযানের যে মিশনটি নিয়ে এতো কথা হচ্ছে, সেই মিশনের পেছনে তারা ব্যয় করেছে ৯৭৮ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, বিটিভির জন্যে আমাদের রাষ্ট্র যে খরচ ব্যয় করবে, তার অর্ধেক দিয়ে ভারত চন্দ্র অভিযান করছে। হয়ত চন্দ্র অভিযানের ব্যর্থতা লাইফলেস বাঙ্গালির জীবনে আনন্দের একটু উপলক্ষ হয়েছে, কিন্তু ভারত নিশ্চয়ই বসে থাকবে না। বসে নেইও।



এখানে বলে রাখা ভাল, চন্দ্রযান ২ ব্যর্থ হবার পর ভারত ইতিমধ্যে চন্দ্রযান ৩ মিশন নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। যে মিশনে তাদের সাহায্য করবে জাপান। এছাড়া চাঁদে মানুষ পাঠাবার জন্যেও তাদের একটি মিশন প্রক্রিয়াধীন আছে ‘গগন যান’ নামে। গগন যান মিশনও বেশ অগ্রগতি হয়েছে। এই মিশনে ভারতকে সাহায্য করছে রাশিয়া। ভারত ভাবছে ‘শুক্রযান ২’, ‘মঙ্গলযান ২’ এবং চাঁদে মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র বানানো নিয়েও। আর আপনি বাঙ্গালি- অন্যের ব্যর্থতায় খুশি হওয়া যার একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম, তিনি খুব দাঁত কেলাচ্ছেন এই ভেবে ভারতের অভিযান ব্যর্থ হয়েছে এর চেয়ে সুখের খবর কিছু হতে পারে না। পিউর শিট!



কিছুদিন আগে একটা খবর বেশ আলোচিত হয়েছিল। নাসা স্পেস এপ চ্যালেঞ্জে ২০১৮ সালে বেস্ট ইউজেস অব ডেটা ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আমাদের বাংলাদেশের সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম ‘অলিক’। তারা আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, নাসায় গিয়ে তাদের পুরস্কার গ্রহণ করবার কথা ছিল। কিন্তু তাদের ভিসা না হওয়ায় যেতে পারেননি।

টিম অলিক যেতে না পারলেও আইসিটি মন্ত্রণালয় ও বেসিসের কিছু কর্মকর্তারা ঠিকই যুক্ত্ররাষ্ট্র গিয়ে নাসা ভ্রমণ করে এসেছেন। ইমিগ্রেশনে নাকি তাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আসল দল আসেনি, আপনারা কেন? তাদের জবাব ছিল, তারা নাকি নাসাকে ধন্যবাদ দিতে সেখানে গেছেন। এই হলো, আমাদের আইসিটি কর্মকর্তাদের অবস্থা। যে দলের কৃতিত্বে নাসায় বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত তাদের ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করতে একটুও বিবেকে লাগেনি সেসব কর্মকর্তাদের। এসব কর্মকর্তারা আবার বড় স্বপ্ন দেখবেন, বড় চিন্তা করবেন – এই আশা কিভাবে সম্ভব?



ভারত তাদের চন্দ্র অভিযানের প্রকল্প শুরু করে ২০০৭ সালে। এক যুগ আগে। আপনার চেয়েও এক যুগ আগে ওরা চাঁদ জয়ের কথা ভাবে, আর আপনি এক যুগ আগের শিশু এখন একটু পোংটা হয়ে তাদের নিয়ে হাসি তামাশা করেন! সেলুকাস। এখনো হিসেব করলে, উন্নত দেশ তো বাদ, ভারত থেকেও আমরা এক যুগ পিছিয়ে আছি।

বাংলাদেশ তাহলে পিছিয়ে আছে কি টাকার অভাবে? অবশ্যই না। বিটিভির পেছনে যদি দেশ ১৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয় করতে পারে, এর অর্ধেক কি বিজ্ঞানখাতে খরচের সামর্থ্য রাখে না বাংলাদেশ? এক আবজাল হোসেনই তো চাইলে একটা চন্দ্র অভিযান নামিয়ে ফেলতে পারে। আবজাল হোসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মকর্তা, ২৪ বছরে দুর্নীতি করে তার সম্পত্তি হয়েছে ১৫ কোটি টাকা, যে টাকায় এক ডজন চন্দ্র অভিযান সম্ভব।



বাংলাদেশে টাকা কোনো সমস্যা না। পুকুর খননের জন্যে বিদেশ সফর হয়, নিরাপদ পানির প্রশিক্ষণের জন্যে উগান্ডা সফর হয়, পর্দার দাম হয় ৩৭ লাখ টাকা, বালিশের দাম ৬ হাজার- এমন দেশে টাকা কোনো সমস্যা না। টাকা যে কোনো সমস্যা না, সেটা আরো স্পষ্ট যখন দেখা যায় বিটিভি বরাদ্দ পায় ১৮৬৮ কোটি টাকা৷ দেশের কোনো ইন্ডিভিজুয়াল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও সামগ্রিকভাবে এতো বাজেট পায় না। শুধু গবেষণা খাতের বাজেট ধরলে সে সংখ্যা বললে পাতি দুর্নীতিবাজরাও ( ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় যেগুলো ‘ছিঁচকে কাজ’) হয়ত লজ্জা পাবে।





শুধু রাষ্ট্রকেও দোষ দেয়ার উপায় নেই, যখন দেখি রাষ্ট্রের জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেরাই পশ্চাদপদ হয়ে থাকতে পছন্দ করে, পদ লেহন করতেই পছন্দ করে, নিজেদের পিছিয়ে থাকাকেও সেলিব্রেট করে। ভারতের চন্দ্র অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর অতি উৎসাহী বাঙ্গালির রিয়েকশন দেখে মনে হলো, আমরা নিজেরা বুঝি মঙ্গল গ্রহ জয় করে ফেলেছি!

এই একই চারিত্রিক প্যাটার্ন সবক্ষেত্রেই আজকাল দেখা যায়। ক্রিকেটে আফগানিস্তানকে যেমন দল হিসেবে বাঙ্গালি গোনায় ধরতেই চায় না, রশিদ খানের বয়স নিয়ে ট্রল করতে পেরে যেন বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ পায় তারা। বীভৎস এক চর্চা, অন্যকে ছোট করার নেশা খুব বাজে নেশা বিশেষ করে অন্যপক্ষ যখন নিজের চেয়েও যোগ্য তখন। এই রাষ্ট্র এবং তার ছোটমন মানসিকতার যে জনগোষ্ঠী তাদের উভয়ের মানসিক উন্নয়ন ঘটুক৷ তা নাহলে এই জনপদের জীবন দিন দিন গুমোট হতেই থাকবে। মুখের জোর দিয়ে কতদূর এগুনো যায়, কাজের বেলায় যদি হই ঠনঠন!
লেখকঃ ডি সাইফ, এগিয়ে চলো ডটকম









Related Articles

Close