মতামত

পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি – আমাদের এমপি বনাম বৃটিশ এমপি!







সিলেটের সুরমা নদী। বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদীর মতোই এই নদীটিও আবর্জনামুক্ত নয়। শহরের মধ্যে বয়ে চলা এই নদী আবর্জনা, দূষণে জর্জরিত। আছে নাব্যতা সংকট। এই প্রেক্ষিতেই সুরমা নদীকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার একটা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে ‘ক্লিন সুরমা গ্রীন সিলেট’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে।



দারুণ ব্যাপার দেখা গেল এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে ঘিরে। সুরমা নদী পরিচ্ছন্নতায় অংশ নিয়েছেন তিনজন বৃটিশ নাগরিক। তবে তারা শুধু সাধারণ নাগরিক নন, তারা তিনজন বৃটিশ এমপি! ১৬ সেপ্টেম্বর এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন তিন ব্রিটিশ এমপি’র নেতৃত্বাধীন ২২ সদস্যের ‘কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’-এর একটি প্রতিনিধি দল। ‘কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ নামক সংগঠনটি মূলত বৃটেনের কনজারভেটিভ পার্টি এবং বৃটেনে প্রবাসী বাঙ্গালীদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে।



সিলেটের সাথে লন্ডন তথা বৃটেনের একটা সম্পর্ক আছে, সবাই জানেন। সিলেটের একটা বড় অংশের মানুষ লন্ডনে বসবাস করেন। তাই, সিলেটে বৃটেনের এমপি বা কোনো নাগরিক এসে ঘুরে যাওয়া হয়ত চমক নয়। কিন্তু, চমক হয়ে দেখা দিলো তাদের কার্যক্রম। বৃটেনের তিন এমপি নিজেরাই মাঠে নেমে পড়েছেন। একদম ময়লার স্তুপে গিয়ে নিজ হাতে ময়লা পরিষ্কার করেছেন। না এটা নিছক ফটোসেশান নয়। এমন নয়, তারা এক হাতে ঝাড়ু দিয়েছেন আর তাদের হাতের উপর একশ হাত ঝড়ো হয়ে ঝাড়ু দেয়ার ভান করে ছবি তোলা হয়েছে।



এমন নয়, তারা পরিষ্কার জায়গায় ময়লা ফেলে সেসব পরিষ্কার করার ভান করে ছবি তুলে চলে গেছেন আর কিছু জ্ঞানগর্ভ ফালতু বাকওয়াজ বকবক করেছেন। তারা সত্যিই ময়লা পরিষ্কার করেছেন, এবং দুই ঘন্টা এই কার্যক্রমে ছিলেন তিন বৃটিশ এমপি। এই তিন ব্রিটিশ এমপি হচ্ছেন- কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ এর প্রেসিডেন্ট অ্যান মেইন, ভাইস প্রেসিডেন্ট পাউল স্কলি এবং বব ব্ল্যাক মেন। তাদের সম্মিলিত কার্যক্রমে ক্বীন সেতুর দক্ষিণের একাংশ পরিষ্কার হয়।



বৃটিশ এমপিত্রয় বলছেন, “সিলেটের সঙ্গে ব্রিটেনের রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক। এখানকার তরুণরা যেভাবে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে এসেছে, তা দৃষ্টান্তমূলক।তাদের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আমরা গর্বিত।” তারা বলছেন প্রয়োজনে এই পরিচ্ছন্নতা প্রকল্পে বৃটেন আরো সহায়তা দিবে। বৃটিশ এমপি এবং তাদের প্রতিনিধি দলটি সিলেট ছাড়াও কক্সবাজার এবং ঢাকাতেও কিছু প্রকল্প পরিদর্শন করবেন।

জানি না, বৃটিশ এমপিদের এরকম কার্যক্রমগুলো আমাদের এমপিদের চোখে পড়ছে কিনা। আমাদের এক এমপি ডেঙ্গু পরিস্থিতির সময় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়েছিলেন সিনেমার নায়ক নায়িকাদের সাথে নিয়ে। পরিষ্কার রাস্তায় ঝাড়ু নিয়ে তাফাল্লিং করেছেন আর শান্ত পরিবেশে ঢেলে দিয়েছেন মশার ঔষধ। কেন এসব করছেন তারা নিজেরাও জানেন না, কিন্তু ফটোসেশান হয়েছে খুব চমৎকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি তো এক ধাপ এগিয়ে, পরিষ্কার রাস্তায় ফেলা ময়লা টুকিয়ে বিরাট পরিচ্ছন্নতার রোল মডেল হয়ে গেছেন একেবারে। উত্তরের মেয়রও এরকম অভিনয় করেছেন।



ডেঙ্গু পরিস্থিতি যখন চরমে তখন আমরা এসব মশকরা দেখেছিলাম আমাদের জ্ঞানী গুণী আর এমপিদের কাছ থেকে। মনে হচ্ছিলো, আমাদের সাথে তারা বোধহয় সারকাজম করছেন। বাংলাদেশি এমপিদের এরকম দুইদিন পর পর ফটোসেশান করে জনসেবক হবার বাসনা জাগে। তারা মাথায় ঝুড়ি উঠান। মাটি কোপান। এই করেন, সেই করেন। কিন্তু মাথায় খালি ঝুড়ি উঠাতেও তাদের সাথে একশ জন কর্মী লাগে, সেই জনসেবার ছবি তোলার জন্যে থাকে আবার দুইশ জন।




আমাদের এমপিও এমপি, বৃটেনের এমপিও এমপি। যারা অন্য একটা দেশে গিয়ে এভাবে একদম নোংরা ময়লার মধ্যে নেমে নিজ হাতে পরিষ্কার করতে পারে, তারা নিজ দেশকে কতটা পরিষ্কার রাখে তা বলাই বাহুল্য। বৃটিশ এই তিন এমপি কোনো শিক্ষা দিতে আসেননি, কিন্তু তারা শিখিয়ে গেছেন অনেক কিছু। পরিষ্কার করতে হলে হাত ময়লা করতেই হবে, যারা পরিষ্কার করতে চায় সত্যিই, তারা ময়লাকে ভয় পায় না।

আর যাদের মনই কুটিলতা আর অপরিচ্ছন্নতায় ভরা তারা কখনো সত্যিকার অর্থে পরিচ্ছন্নতা, স্বচ্ছতাকে পছন্দ করে না, তাই তারা কেবলই পরিচ্ছন্নতার অভিনয় করে৷ একদিন আমাদের এমপিরাও অভিনেতা কম নেতা হবেন বেশি, ভান করবেন কম, পরিচ্ছন্ন হবেন বেশি- এরকম দুরাশা এখনো করি। দেখি কোনোদিন আসে কিনা এমন দিন…
লেখকঃ ডি সাইফ, এগিয়ে চলো।

Related Articles

Close