আলোচিত খবরসিলেট

সিলেটে ছোট ভূমিকম্পে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা :বিশ দিনের মধ্যে দুটি ভূমিকম্প







বিশ দিনের ব্যবধানে দুইবার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠেছে সিলেট। গত শনিবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকালে কম্পন আর বিকট শব্দে ঘুম ভাঙ্গে সিলেটবাসীর। এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি রাত ২টার দিকে আরেক দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয় সিলেটে। রিখটার স্কেলে ওই কম্পনের মাত্রা ছিলো ২.৫ আর গত শনিবারের কম্পনের মাত্রা ছিল ২.৯।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই কম্পনের মাত্রা মৃদু হলেও পরপর ঘন ঘন ছোট ভূ-কম্পন বড় ধরণের ভূমিকম্পেরই পূর্বাভাস।



এমনিতেই ভূমিকম্পের ডেঞ্জারজোনে অবস্থান সিলেটের। ফরাসি ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম ১৯৯৮-এর জরিপ অনুযায়ী ‘সিলেট অঞ্চল’ ১০০ বছরের বেশী সময় ধরে সক্রিয় ভূ-কম্পন এলাকা হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। ফলে সিলেটে বিশ দিনের মধ্যে দুটি ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে।

এদিকে, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নীতিমালা না মেনে ভবন নির্মাণসহ নানা কারণে বড় ভূমিকম্প হলে এখানে বড়ধরনের বিপর্যয়েরই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, রিখটার স্কেলে পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সিলেটের আশি ভাগ ভবনই ধ্বসে পড়বে। সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে এ অঞ্চলের প্রায় ৯৫ ভাগ স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রাণ হারাবে ১২ লাখ মানুষ এবং টাকার অংকে ক্ষতি হবে ১৭ হাজার কোটি।



সিলেট আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একই জায়গায় বার বার ভূমিকম্প হলে সামনে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘ছোট ছোট ভূমিকম্পের পর যেমন বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে তেমনি বড় ভূমিকম্পের পরও অনেকগুলো ছোট ভূমিকম্প হয়। তবে এক্ষেত্রে বিষয়টা উৎপত্তিস্থলের উপর নির্ভর করে। যদি একই জায়গায় বার বার ভূমিকম্প হয় তাহলে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে। তবে সিলেটের প্রেক্ষাপটে এই আশঙ্কা সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা যাচ্ছে না। কারণ বিগত দুটি ভূমিকম্পই অনেক ছোট ছিল। যার ফলে সিলেট স্টেশন ছাড়া অন্য কোনো স্টেশনে এই কম্পন ধরা পড়েনি।



তিনি বলেন, সাধারণত ভূমিকম্পের গভীরতা যদি কম থাকে তাহলে ব্যাপ্তি কম হয়। যার জন্য গত ২টি ভূমিকম্প সিলেট ছাড়া অন্য কোনো স্টেশন থেকে সার্বিক বিষয় রেকর্ড করতে পারেনি। গত ১৪ জানুয়ারির ভূমিকম্প এত ছোট ছিল যে দূরত্বও বের করা যায়নি। তবে গত শনিবারের ভূমিকম্প মোটামুটি রির্পোটেবল ছিল। তাই আমরা শুধুমাত্র দিক, দূরত্ব ও মাত্রা বের করতে পেরেছি কিন্তু উৎপত্তিস্থল বের করতে পারিনি। যদি আরও ২টি স্টেশনে ভূমিকম্প ধরা পড়ত তাহলে উৎপত্তিস্থল বের করা যেত।



সাঈদ আহমদ বলেন, ‘গত শনিবার সিলেটের ৪০ কিমি দূরে ২.৯ মাত্রায় ভূমিকম্প হয়। ডাউকির যে জায়গায় ১৮৯৭ সালে বড় ভূমিকম্প হয়েছিলো, যেখানে ফল্টও রয়েছে, সেই স্থানে অথবা তার আশপাশের জায়গা থেকেই এ ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এমনটি হয়ে থাকলে অবশ্যই একটি বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা আছে বলে মনে করেন আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমেদ চৌধুরী।

এদিকে, প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে দিনদিন বাড়ছে আকাশছোঁয়া ভবন তৈরির প্রতিযোগিতা। ভরাট হচ্ছে জলাধার। কেটে ফেলা হচ্ছে পাহাড় টিলা। এতে বাড়ছে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কাও।

গবেষকদের মতে, সিলেটের অধিকাংশ বাণিজ্যিক ভবনই অপরিকল্পিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ। রিখটার স্কেলে সাত বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে অধিকাংশ ভবনই ভেঙ্গে পড়বে।



গবেষকরা জানিয়েছেন, অপরিকল্পিত বাসাবাড়ি নির্মাণের কারণে সবচেয়ে বেশী ক্ষতির সম্মুখীন হবে নগরীর শাহজালাল উপশহর, আখালিয়া, বাগবাড়ি, মদিনা মার্কেট প্রভৃতি এলাকা। বাণিজ্যিক ভবন ও ইমারতের পাশাপাশি নগরীতে অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। গবেষণার তথ্য মতে, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বহু বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে যেগুলো ভূমিকম্পের সময় ধসে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। আর এসব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ধসে পড়লে প্রাণহানি আরও বেড়ে যাবে।

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ, জাপান ও শ্রীলংকার একটি বিশেষজ্ঞ টিম সিলেট নগরীর ৬ হাজার ভবনের উপর জরিপ চালিয়ে এই গবেষণা রিপোর্ট তৈরি করেন।

শ্রীলংকা থেকে আগত প্রফেসর আরঙ্গা পোলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. হুমায়ূন আখতার, প্রফেসর ড. আপ্তাব আহমেদ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাকসুদ কামাল ও ড. জাহাঙ্গীর আলমসহ জাপান থেকে আগত আরও দু’জন বিশেষজ্ঞ এই গবেষণা রিপোর্টটি তৈরি করেন।



এ প্রসঙ্গে ড. জহির বিন আলম বলেন, ভূমিকম্পের দিক থেকে সিলেট মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও তাৎক্ষণিক ক্ষতি-হ্রাস ও উদ্ধার কাজ চালানোর জন্য সিলেটে আধুনিক কোন যন্ত্রপাতি নেই। তিনি ভূমিকম্পের ঝুঁকি মাথায় রেখে এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানান।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের খড়বপুর আইআইটি ইন্সটিটিউটের প্রফেসর এস.কে নাথ ২০০২ সালে প্রকাশিত তার এক গবেষণা রিপোর্টে আশংকা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ২০১০ সালের মধ্যে ভারতের আসাম এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বড়ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। প্রফেসর এস.কে নাথের এই গবেষণায় সহযোগী হিসাবে কাজ করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ড. জহির বিন আলম।



ড. জহির বিন আলম ওই গবেষণার কথা উল্লেখ করে জানান, রিপোর্টে ভূমিকম্পের বিভিন্ন দিক গবেষণা-পর্যালোচনা করে এমন আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, সিলেটে নতুন ভবন নির্মাণসহ সার্বিক নগরায়নে ভূমিকম্প ঝুঁকির কথা বিবেচনায় রাখা হচ্ছে না। এছাড়া পুরনো অসংখ্য দুর্বল ভবনও রয়েছে।

ভূমিকম্প বিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে জানা যায়, ভূমিকম্পের মাত্রা অনুসারে বাংলাদেশ তিনটি ভূ-কম্পন বলয়ে বিভক্ত। এর মধ্যে এক নম্বর বলয়ে রিখটার স্কেলে ৭ থেকে ৯ বা তার অধিক মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। আর এই এক নম্বর বলয়েই সিলেটের অবস্থান। এই বলয়ে আরও রয়েছে ময়মনসিংহ ও রংপুর।



অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে ঘনঘন ভূমিকম্পের উৎপত্তি হলে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে যদি একই জায়গা থেকে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয় তাহলে অবশ্যই চিন্তার বিষয়। এরকম ঘনঘন ভূমিকম্প হলে আমাদের একটু সর্তক থাকতে হবে।



এ ব্যাপারে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান বলেন, পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য সিলেট নগরীকে নিয়ে একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা হয়েছিলো। তবে এতে কিছু ত্রটি থাকায় তা সংশোধনের জন্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আছে। এটি অনুমোদিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এবং অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ভবনগুলোর তালিকা তৈরির কাজ হচ্ছে।
সূত্রঃ সিলেট টুডে২৪


Related Articles

Close