বিশেষ প্রতিবেদনমতামতসারাদেশ

কেন পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেল বাংলাদেশ?







স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভূস্বর্গ নয় বাংলাদেশ । দেশটি এখনও দরিদ্র, জনসংখ্যার ভারে ন্যুজ্ব। শিক্ষার হার কম, দুর্নীতিগ্রস্ত। প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়। মাঝেমাঝে সন্ত্রাসবাদও প্রত্যক্ষ করে দেশটি।

এছাড়া গণতন্ত্র যে প্রহসনমূলক তা গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু দেশটি মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে বলে আগে যেমনটা বলা হতো, সেই চিত্র অনেক বছর আগেই পাল্টে গেছে। আজকে অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন যে, এই দেশটিই হবে পরবর্তী এশিয়ান টাইগার।

গত বছর দেশটির প্রবৃদ্ধির হার (৭.৮%) ভারতের কাতারে পৌঁছেছে। পাকিস্তানের (৫.৮%) চেয়ে বেশি তো বটেই। বাংলাদেশীদের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ (৪৩৪ ডলার) পাকিস্তানিদের (৯৭৪ ডলার) চেয়ে অর্ধেকেরও কম। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ (৩২০০ কোটি ডলার) পাকিস্তানের (৮০০ কোটি ডলার) ৪ গুণ।



এই প্রবৃদ্ধির অনেকটাই রপ্তানির কল্যাণে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় শূন্য। সেখান থেকে ২০১৮ সালে তা পৌঁছেছে ৩৫৮০ কোটি ডলার। আর পাকিস্তানের ২৪৮০ কোটি ডলার। আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর হিসাব বলছে, ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ১৮০০০ কোটি ডলার থেকে ৩২২০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে।

অর্থাৎ, গড়ে প্রতি বাংলাদেশি আজ যতটা সম্পদশালী তা গড়ে পাকিস্তানিদের প্রায় সমান। রুপির দর যদি আরও কমে, ২০২০ সাল নাগাদ নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশীরা পাকিস্তানিদের চেয়ে গড়ে অধিক ধনী থাকবে।



অন্যান্য সূচকও সমানভাবে ঈর্ষণীয়। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ২০ লাখ। পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল ৩ কোটি ৩৭ লাখ। আজকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক কম। ১৬ কোটি বনাম ২০ কোটি। বলিষ্ঠ পরিবার পরিকল্পনা প্রচারণার মাধ্যমে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রোধ করতে পেরেছে। এ ধরণের কোনো প্রচারণা, এমনকি প্রাথমিক পর্যায়েও, পাকিস্তানে এখনও দৃশ্যমান নয়।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতও কম অগ্রগতি সাধন করেনি। পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে অনেক কম সংখ্যক শিশু জন্মের সময় মারা যায়। বাংলাদেশে টিকাদান খুবই সাধারণ ব্যাপার। সেখানে কেউ পোলিও টিকা খাওয়াতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় না।



বাংলাদেশের আয়ুষ্কাল (৭২.৫ বছর) পাকিস্তানের (৬৬.৫ বছর) চেয়ে অনেক বেশি। আইএলও’র মতে, বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীর হার (৩৩.২ শতাংশ) পাকিস্তানের (২৫.১ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি।

পশ্চিম পাকিস্তানের এই দরিদ্র জ্ঞাতিভাই কীভাবে তার সমৃদ্ধতর আত্মীয়কে এত দ্রুত টপকে গেল? এই প্রশ্ন আরও গোলমেলে ঠেকবে যদি চিন্তা করেন যে বাংলাদেশের এমন কোনো ভূরাজনৈতিক সম্পদ নেই যা কিনা আমেরিকা, চীন বা সৌদি আরবের কাছে বিক্রিযোগ্য।



দেশটির নেই কোনো পারমাণবিক অস্ত্র, খুবই শক্তিশালী কোনো বাহিনী, কিংবা পর্দার আড়াল থেকে দেশ চালানোর মতো উর্দিধারীও দেশটির নেই। এমনকি খুবই উঁচুমানের পেশাদার লোকের সংখ্যা যে ভুরিভুরি তা-ও নয়। এমনকি জন্মের সময় পূর্ব পাকিস্তানের ছিল না কোনো প্রশিক্ষিত আমলাতন্ত্র। পূর্বতন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের মাত্র একজন কর্মকর্তাকে পেয়েছিল বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের অগ্রগতিতে আমার মতো সেই পশ্চিম পাকিস্তানিদেরই সবচেয়ে বেশি অবাক হওয়া উচিৎ। আমরা যারা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে স্কুলে যেতাম তারা বড় হয়েছি প্রকট বর্ণবাদের মধ্য দিয়ে। খর্বকায় ও শ্যামবর্ণের বাঙালিরা শুধু ভালো ছিল পাট, ধান উৎপাদন ও মাছ ধরাতে। তারা মুসলিম ছিল, পাকিস্তানিও ছিল।

কিন্তু শিশু হিসেবে আমাদেরকে এটাই চিন্তা করতে শেখানো হতো যে ভালো মুসলমান ও পাকিস্তানিরা লম্বা, সুন্দর হয়, কথা বলে চোস্ত উর্দুতে। রেডিও পাকিস্তানে অদ্ভুত কণ্ঠের বাংলা সংবাদ সম্প্রচারের সময় আমরা পাগলের মতো হাসতাম। আমাদের নির্বোধ পুরুষতান্ত্রিক দুনিয়ায়, এই কথাগুলো অনেক বেশি মেয়েলি মনে হতো।



১৯৭১ সালের সেই আত্মসমর্পণ পশ্চিম পাকিস্তানিদের কিছুটা সংযত করেছে। এরপরও দ্বি-জাতি তত্ব যখন অকার্যকর হয়ে গেল, তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই নিজের মননে পরিবর্তন আনতে পারলো না।

পশ্চিম পাকিস্তান নিজেকে পাকিস্তান বলে ঘোষণা করলো। এমনকি অনেকেই ভাবলো, এটি হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য হবে। তারা বলাবলি করতে লাগলো, বাংলাদেশ কখনই অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে পারবে না। এরপর ফের পাকিস্তানের অংশ হতে অনুনয়-বিনয় করবে।



আশাবাদী কেউ কেউ অবশ্য ভেবেছিলেন, এই বিপর্যয় থেকে পাকিস্তান কঠিন এক শিক্ষা পেল, যার ফলে পরিবর্তন হবে অবশ্যম্ভাবী। জনপ্রিয় ‘রোটি, কাপরা, মাকান’ শ্লোগানের প্রতি উৎসাহ সহকারে সাড়া দিয়ে, তারা ভাবলো পাকিস্তান হয়তো অতিসুবিধাভোগী ব্যক্তিবিশেষের বদলে সকলের মঙ্গলের কথা ভাববে।

এটাও অনেকে ভেবেছিলেন যে, পাকিস্তানের সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের মনোভাবের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। কিন্তু এসবের কিছুই ঘটেনি। বরং, আমরা আগে যেমনটা ছিলাম, তেমনটা আরও বেশি করে হয়েছি। প্রতিশোধের তৃষ্ণায় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার ছাড়া কিছুই ভাবতে পারলো না।



আত্মসমর্পণের মাত্র ৬ সপ্তাহ পর পারমাণবিক বোমার জন্য জুলফিকার আলি ভুট্টো গোপন আহ্বান জানান। এরপরই হয় সেই আলোচিত মুলতান সভা। কর্তৃত্বের এমন কেন্দ্রীভূতকরণের ফলে যে অসন্তোষ জন্ম দেয়, সেই শিক্ষা আর নেওয়া হলো না। ১৯৭৩ সালে ভুট্টো বেলুচিস্তানে এনএপি সরকার ভেঙ্গে দেন। সামরিক পদক্ষেপের নির্দেশ দেন। এরপর থেকে যেই স্থানীয় বিদ্রোহ শুরু হলো তা আর কখনই শেষ হলো না। এভাবেই তিনি তাদেরই ক্ষমতায়ন করলেন যারা তাকে শেষ অবদি ফাঁসিতে চড়ায়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশ আর পাকিস্তান আজকে ভিন্ন দু’টি দেশ কারণ তারা তাদের জাতীয় স্বার্থকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে দেখে। বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ দেখে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে।

দেশটি রপ্তানি বৃদ্ধি, বেকারত্ব হ্রাস, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, ঋণ ও সাহায্যের ওপর নির্ভরতা হ্রাস, ক্ষুদ্র ঋণ আরও ছড়িয়ে দেওয়া, ইত্যাদি লক্ষ্যবস্তু ঠিক করেছে। ভারতের সঙ্গে অবশ্য পানি ও সীমান্ত বিরোধ বেশ গুরুতর বিষয়। এছাড়া বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটির কাছ থেকে অবৈধ অভিবাসন, মাদক ইত্যাদি ইস্যুতে কটুকথা শুনতে হয় বাংলাদেশের। কিন্তু দেশটির মৌলিক অগ্রাধিকার এখনও আগের মতই।



পাকিস্তানের ক্ষেত্রে, মানবসম্পদ উন্নয়ন হলো দূরবর্তী দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতীয় সম্পদের অনেকটাই বরাদ্দ থাকে ভারতকে হারানোর জন্য। আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক তাই ভালো নয়। পাকিস্তানের অভিযোগ, দুই প্রতিবেশী দেশই ভারতের সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠ।

কিন্তু নিরাপত্তা-কেন্দ্রীক মনোভাবের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পরিণতি হলো নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা ও আশ্রয়প্রশ্রয় দেওয়া। ২০১৪ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের এপিএস হত্যাযজ্ঞের পর তাদেরকে শেষ অবদি দমন করতেই হলো। সেই দিনটি আবার কাকতালীয়ভাবে ছিল ৪৩ বছর আগে ঢাকা হারানোর দিন।

বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে। কিন্তু বহুসাংস্কৃতিক ও উদারমনা হওয়ায়, সেখানে নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ক্ষমতা লাভ থেকে দূরে রাখতে পেরেছে। যদিও নির্বাচিত বা সেমি-নির্বাচিত রাজনীতিকরা খুবই দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য, তারা অন্তত নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে তারা শেষ অবদি ভোটারদের কাছে কিছুটা দায়বদ্ধ। অস্ত্র বা বিরাট সামরিক ব্যবস্থার বদলে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা হলেও বিনিয়োগে তারা বাধ্য।



পাকিস্তানের জন্য এসবই শিক্ষণীয়। সিপিইসি হোক আর না হোক, ভারতের সঙ্গে ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে পাল্লা দেওয়া অসম্ভব। সময় এসেছে বাস্তবসম্মত হওয়ার। ছাদের ওপর থেকে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে ভেতরে ভেতরে আমেরিকান, চাইনিজ বা সৌদিদের কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে আমরা কোথাও যেতে পারিনি।

আমরা পঞ্চম প্রজন্মের উচ্চপ্রযুক্তির গোপন ষড়যন্ত্রের শিকার, এমনটা ঘোষণা দিয়ে আমরা জাতীয় আতঙ্ক হয়তো আরও উস্কে দিতে পারি। কিন্তু এসব স্রেফ অর্থহীন। সামনে এগিয়ে যেতে হলে পাকিস্তানকে অবশ্যই নিজের যুদ্ধ-অর্থনীতিকে বদলে শান্তি-অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হবে।



লেখক: পারভেজ হুদভয় : পাকিস্তানের আলোচিত কলাম লেখক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক একং লাহোরের একটি কলেজের অধ্যাপক।
সূত্র: ডন

Related Articles

Close