সিলেট

ঢাকা-সিলেটসহ মহাসড়ক গুলোতে ডাকাত আতঙ্ক







দেশের মহাসড়কগুলো ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রায়শঃ কোন না কোন মহাসড়কে যানবাহন থামিয়ে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের পাশাপাশি রোগী ও লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স এমনকি বিয়ের গাড়িও ডাকাতির শিকার হচ্ছে। তবে ডাকাতদের সবচেয়ে বেশি টার্গেট দামী গাড়ি ও নাইট কোচ।

মহসড়কে কোন যানবাহন যানজটের কবলে পড়লেই ডাকাতরা টার্গেট করে তাতে হামলা করে সর্বোস্ব লুটে নেয়। অপ্রতিরোধ্য এসব ডাকাত চক্র আগ্নেয় ও ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিত্য নতুন কৌশলে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ডাকাত আতঙ্কের কারণে খুবই জরুরী প্রয়োজন ছাড়া রাতে পরিবারসহ মহাসড়কে চলাচল একেবারে কমে গেছে।



সড়কে চলাচলকারী চালকসহ সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যপ্ত নিরাপত্তা ক্যাম্প না থাকা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের স্বল্পতার কারণে বেশিরভাগ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এছাড়া ডাকাতদের সাথে হাইওয়ে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যদের যোগসাজস ও ডাকাতি সংঘটনকালে পুলিশ কর্তৃক বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক গুরুত্ব না দেয়ায় এসব ঘটনা ঘটেই চলছে।



ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-সিলেটসহ অন্যান্য অঞ্চলের মহাসড়কগুলোতে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে চলছে। ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসার পথে অস্ত্রের মুখে একটি নৈশকোচে দুধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের ১৬ মে হবিগঞ্জের মাধবপুরে ঢাকা সিলেট মহাসড়কে রতনপুর এলাকায় গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা পয়সা ও মালামাল লুট করে নিয়ে যায় সংঘবদ্ধ ডাকাত দল।



গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পরিবারসহ ময়মনসিংহের ত্রিশালে যাওয়ার পথে গাজীপুরের টঙ্গীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ডাকাতের কবলে পড়েন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক কবির আহমেদ খান। সশস্ত্র ডাকাতরা তাদের গাড়ির কাচ ভেঙে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোন ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র লুটে নিয়ে যায়। এছাড়া ডাকাতদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কবির আহমেদসহ তার স্ত্রী ও দুই সন্তান আহত হন।



এ বছর ১৫ জানুয়ারি মহেশখালী যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের এশিয়ান হাইওয়ের কাঞ্চন পৌরসভা এলাকায় আন্তঃজেলা ডাকাত দলের কবলে পড়েন ঢাকার এক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের চার কর্মকর্তা। ডাকাতরা তাদের প্রাইভেটকারের গতিরোধ করে জানালা ভেঙে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ ৪০ হাজার টাকা, ৫টি মোবাইলসেটসহ কমপক্ষে ২ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। ডাকাতদের বাধা দিতে গেলে ৪ জনকে পিটিয়ে আহত করা হয়।



এর আগে ৪ জানুয়ারি রাতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মহাসড়কে ডাকাতদের কবলে পড়েন বিমান বাহিনীকে নিয়ে শর্ট ফিল্ম করতে যাওয়া একটি শ্যুটিং টিম। ভুক্তভেগী পরিচালক সম্রাট বলেন, শ্যুটিং টিম গজারিয়া হাইওয়েতে জ্যামে আটকে ছিল। হুট করেই কয়েকজন লোক এসে চাপাতি দেখিয়ে গাড়ির দরজা খুলতে বলে। চালক খুলতে অস্বীকৃতি জানালে তারা জানালার গ্লাস ভেঙ্গে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নগদ লাখ খানেক টাকা, শ্যুটিংয়ের সরঞ্জামাদি, ল্যাপটপ, একটি আইফোনসহ ১০টির বেশি স্মাটের্ফান ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সম্রাট আরও বলেন, ঘটনার পর বিষয়টি গজারিয়া হাইওয়ে পুলিশকে জানালেও তারা তখন তেমন কোনো সাহায্য করেনি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংশ্লিষ্ট চালক ও নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলো ৬-৭টি ডাকাত চক্রের হাতে জিম্মি। বিশেষ করে কুমিল্লার চান্দিনা ও ফেনীর লালপুল থেকে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের কুমিরা পর্যন্ত ৭টি পয়েন্টে বেশিরভাগ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। জানা যায়, ডাকাতরা মালামাল ভর্তি ট্রাক, কাভার্ডভ্যান চালকদের হাত-পা বেঁধে, কখনো হত্যা করে আবার কখনো অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে সর্বোস্ব লুটে নেয়। কখনো চলন্ত গাড়ির সামনে গাছ ফেলে বা কোন কিছু দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ টাকাসহ মূলবান মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় কেউ কেউ অভিযোগ করলেও অনেকে হয়রানি এড়াতে পুলিশের দ্বারস্থ হয়না।

মহাসড়কে চলাচলসত গাড়ির চালকরা বলেন, মহাসড়কে যখন যানজট বাড়ে তখনই ছিনতাই ও ডাকাতির তৎপরতা বেড়ে যায়। চালকদের ভাষ্য, হাইওয়েতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব থাকায় ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটে। এছাড়া বেশিরভাগ সময় ডাকাত চক্র ধরা ছোয়ার বাইরে থাকায় তারা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।

কুমিল্লা অঞ্চলের হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, কুমিল্লা অঞ্চলে মহসড়কে হাইওয়ে পুলিশের ফাঁড়ি রয়েছে মাত্র ১১টি। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যাও অনেক কম। যার কারণে ডাকাত ও ছিনতাই চক্রকে প্রতিরোধ করা কঠিন হচ্ছে। তবে এসব চক্রকে ধরতে তারা গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধিসহ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও প্রায় সময় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ঢাকা-ময়মনসিংহের ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ থেকে কুলিয়ারচরের নোয়াগাঁও-ছয়সূতি; দ্বারিয়াকান্দি থেকে বাজরার মাঝামাঝি অঞ্চলটি সশস্ত্র ডাকাতদের দখলে। এসব সড়কে চলাচলকারী জ্বালানিবাহী ট্যাংক লরি, মালবাহী ট্রাকে বেশি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাতে এই হাইওয়ের কুলিয়ারচর উপজেলার আলী আকবরী গ্রামের সামনে মহাসড়কে গাছ ফেলে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে অন্তত ৩০-৩৫টি গাড়ি থেকে নগদ টাকাসহ কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নেয় ডাকাতরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাতে পর্যাপ্ত পুলিশি টহল না থাকা এবং ডাকাতির সময় পুলিশের গাড়ি দূরে অবস্থান করার কারণে ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটে।

এদিকে, ডাকাতি ও ছিনতাইকারীদের দমাতে প্রায়শঃ অভিযান চালিয়ে তাদেরকে আটক করা হয়। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসের শুরুতে ৬ ডাকাতকে আটক করে র‌্যাব। ওই বছরের ৬ নভেম্বর র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে বাহিনী আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান মুফতী মাহমুদ খান বলেন, নিজেদের র‌্যাবের সদস্য পরিচয় দিয়ে ডাকাতি করতো চক্রটি। তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি, হ্যান্ডকাফ, ওয়াকিটকি সেট, র‌্যাবের জ্যাকেটসহ সিগন্যাল লাইট, বড় লাঠি, দড়ি, চোখ বাঁধার কালো কাপড় এবং ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত কালো গ্লাসের একটি মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব জানায়, চক্রটি হবিগঞ্জ, সীতাকুন্ড, আশুলিয়া, চান্দিনা, কেরানীগঞ্জ, নরসিংদী, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, সিরাজগঞ্জ, টঙ্গী, চৌদ্দগ্রামসহ বিভিন্ন হাইওয়ে এলাকায় ডাকাতি ও অপহরণ করে। র‌্যাবের বর্ণনা মতে, চক্রটি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে দুটি ও অক্টোবরে ১১টি ডাকাতি ও অপহরণ করে। এছাড়া ২০১৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সীতাকুন্ডের কুমিড়ায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সেলিম নামে এক ডাকাত নিহত হয়। এর আগে ২০১৬ সালের ১৮ নভেম্বর ফেনীতে দু’জন, ২৯ অক্টোবর মিরসরাইয়ে তিনজন এবং ১৮ এপ্রিল জোড়ারগঞ্জে দুই ডাকাত মারা যায়।

হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, মহাসড়কে সাধারণত গতিশীল কোন যানবাহন ছিনতাই বা ডাকাতির কবলে পড়ে না। তবে যানজটের সময় মাঝে মধ্যে এমন দুই একটি ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, হাইওয়েতে সবসময় মোবাইল টিম সোচ্চার থাকে। এছাড়া মোটরসাইকেল নিয়ে টহল চলমান থাকে।

এদিকে, মহাসড়কে চলমান এসব ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাইওয়ে পুলিশের আঞ্চলিক ও সদর দফতরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, মহাসড়কে চলমান ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধে নিয়মিতভাবে টহল ও অভিযান চলমান রয়েছে। তবুও এর মধ্যে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, মহাসড়কের দুরত্বের তুলনায় পর্যাপ্ত ক্যাম্প ও পুলিশ সদস্যের স্বল্পতা রয়েছে। এসব সঙ্কট দ্রুত ধীরে ধীরে দূর করার চেষ্টা চলছে।ইনকিলাব

Related Articles

Close