প্রবাসভিসার খবরমতামত
Trending

জীবন বাজি রেখে একজন বাংলাদেশীর ইউরোপে যাওয়ার গল্প







ইউরোপের দেশ গ্রিস বা ইতালিতে কর্মরত পরিচিতদের ডাক পেয়ে জীবন বাজি রেখে অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশের সীমান্ত পেরুনোর বিপজ্জনক পথে পা বাড়ায় বাংলাদেশি যুবকরা । অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াকে পাচারকারী দালালরা বলে ‘গেম’।
কিন্তু এই ‘গেম’-এর অংশ হবার পর প্রতারকদের হাতে জিম্মি হয়ে সে ঘোর কাটে তাদের। তখন আর করার কিছু থাকে না। দালাল-প্রতারকদের হাতে জিম্মি হয়ে পথে পথে দফায় দফায় অমানবিক নির্যাতন আর লক্ষ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ গুনতে হয়। ততদিনে পরিবার হারায় শেষ সম্বলটুকুও।



শুনবো উমান, ইরান, তুর্কি হয়ে ইরোপ আশার কিছু বাস্তব ঘটনা

স্পিড বোটে আরব সাগর পাড়ি
ভুক্তভোগী বহু বাংলাদেশি সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দালালদের খপ্পড়ে পড়ার পর এই দালালের ঘর থেকে আর বেরুতে পারে না। এক বেলা, আধা বেলা করে খেয়ে সেখানে কাটে কয়েকটি দিন। এরপর তাদেরকে রাতের অন্ধকারে ওমানের সীমান্তে নিয়ে সেখানকার জঙ্গলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন অপেক্ষা করানো হয়। কারণ, সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ‘গেম’ শুরুর জন্য অনুকূল সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সবকিছু অনুকূল হলেই ‘শুরু হয় ‘গেম’ বা অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার পর্ব।



ওমানের আল-খুদ নামক জঙ্গলে রাতের পর রাত না খেয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে আমাদের। স্পিড বোট না আসায় সকালে ফিরে গেছি দালালের ডেরায়। পরের রাতে আবারও অপেক্ষা। এভাবে প্রায় আট রাত অপেক্ষার পর ‘গেম’-এর জন্য সিগন্যাল ক্লিয়ার হয়।

আরব সাগরের তীরেই আসে স্পিড বোট। তবে একেবারে তীরে আসাটা ঝুঁকিপূর্ণ। সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা পড়ার আশংকা থেকেই যায়। তাই সাগরে গিয়ে যাত্রীদের কখনও কোমর পানি কখনও বা গলা সমান পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। স্পিডবোট এলে মাত্র মিনিট খানেক সময় মেলে।



এর মধ্যেই সকলকে এক রকম লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে উঠতে হয় বোটে। কেউ যদি উঠতে না পারে, তাকে সেখানেই পড়ে থাকতে হয়। এভাবে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে, সাগরের নোনা পানি খেয়ে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্পিডবোটে এরকম কেউ আছে দালালরা সেটা বুঝতে পারলেই আর রক্ষা নেই। সঙ্গীদের চোখের সামনে তাকে সাগরেই ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়।

“চারদিকে আরব সাগরের পানি। কিন্তু এক ফোঁটা খাওয়ার পানি নেই কোথাও। আমাদের স্পিডবোটে একজন পানির জন্য কাতরাচ্ছিল। শরীরও দুর্বল হয়ে পড়েছিল তার। মারা যেতে পারে এমন আশঙ্কায় দালালরা সবার চোখের সামনে তাকে সাগরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। অথচ নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেই তারা টাকা নিয়েছিল।’



এক স্পিড বোটে একাধিক দালালের হাতে জিম্মি শ্রমিকদের আনা হয়। বাংলাদেশি ছাড়াও ইরানি, পাকিস্তানি এবং ওমানি দালালদের হাতে জিম্মি হওয়া শ্রমিক যেমন ছিল, তেমনি দালালদের নিজেদের দেশের দেশের শ্রমিকও ছিল বলে জানান আলতাফ। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আরব সাগরের ওপর জিম্মি শ্রমিকদের নিয়ে ছুটে চলে স্পিড বোট। এরপর এক সময় হরমুজ প্রণালি পার হয়ে ইরানের জল সীমায় প্রবেশ করে স্পিডবোট। সেখান থেকে ডাঙায় নেমে তাদেরকে পৌঁছে দেওয়া হয় সাগরতীরবর্তী জঙ্গলে।



অর্থ আদায়ের চোরা কুঠি
ইরানের জঙ্গলই পাচারকারীদের জন্য অর্থ আদায়ের চোরাকুঠি হয়ে উঠেছে। এখানে আনার পর যাত্রীদের ওপরে অত্যাচার চরমে পৌঁছে। সেখানে একেক দালালের একেকটি কেম (ক্যাম্প) বা ঝুপড়ি ঘর আছে। এই কেমে নিয়ে যাত্রীদের কাছে তাদের পরিবারের লোকদের মোবাইল নম্বর চাওয়া হয়। তারপর ওইসব নম্বরে ফোন করে দালালরা বিরাট অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে।

এ সময় যাত্রীদের ওপর চালানো হয় নির্মম অত্যাচার। আর যাত্রীদের ভয়ার্ত আর্তনাদ শোনানো হয় তাদের স্বজনদের।পরিবারের প্রিয় মানুষটির প্রাণ বাঁচানোর জন্য দিশেহারা স্বজনরা তখন সব সম্বল বিক্রি করে হলেও মুক্তিপণ দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাড়ি থেকে টাকা পাঠাতে দেরি করলে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। অনাহারে অর্ধাহারে থেকে, নানা অখ্যাদ্য খেয়ে, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হতে কেউ কেউ মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়ে।আর যারা সহজে টাকা দিয়ে দেয় তাদের উপর ‘আরও’ টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে দালালরা।



হেঁটে পাড়ি দিতে হয় মরুভূমি, পাহাড় আর বরফঢাকা পথ
ইরানের দালালরা মুক্তিপণ পাওয়ার পর জিম্মি বাংলাদেশি শ্রমিকদের তুরস্কের উদ্দেশ্যে পাঠায়। মূলত তুরস্কের দালালদের হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্তই তাদের দায়িত্ব। তবে ইরান থেকে তুরস্কে ঢুকতে হলে পাড়ি দিতে হয় মাইলের পর মাইল মরুভূমি, পাহাড় এমনকি বরফে ঢাকা পথও। না খেয়ে, এক কাপড়ে টানা কয়েকদিন ধরে হেঁটেই সেসব পথ নিয়ে যায় দালালরা। শ্রমিকরা হেঁটে এগুলেও দালালরা চলে কখনো গাড়ি চড়ে, কখনো ঘোড়ায় বা খচ্চরের পিঠে চড়ে।



আরেক বাংলাদেশি শ্রমিক যাত্রাপথের দু:সহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন:
খাবার দূরে থাক, প্রচন্ড পানির পিপাসায়ও একফোঁটা পানি মেলেনি। রাত কেটেছে মরুভূমিতে, পাহাড়ের গুহায়। আমি একটি হাফ প্যান্ট পরে বরফের মধ্য দিয়ে হেঁটে তুরস্ক পৌঁছাই। তুরস্ক- ইরান সীমান্তে সীমান্তরক্ষীদের হাতে পড়ার ভয় খুব বেশি না থাকলেও মুরভূমি আর বরফের কারণে অনেকেরই যাত্রা সেখানেই শেষ হয়।”

যাত্রাপথে একাধিক মানুষের লাশ দেখেছেন জানিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি:
সে দৃশ্য না কতটা অমানবিক না দেখলে কাউকে বিশ্বাস করানো কঠিন। শুধু ভাল আয়ের আশায় বেরিয়ে কুকুরের মত রাস্তায় লাশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি মানুষগুলোকে। আমার আত্মীয় নয়, তবুও তাদের জন্য বুক ফেটে কান্না আসে আমার। আমি সেসব দিনের কথা আর মনে রাখতে চাই না।”



তুরস্কের সেফ হোম নামের আরেক বিভীষিকা
অবর্ণনীয় সব যন্ত্রণা সহ্য করে যারা টিকে থাকেন, তারাই পৌঁছান তুরস্কে। তবে ছাড়ার আগে তুরস্কে অবস্থানকারী দালালরা আরেক দফা জিম্মি করে অসহায় দরিদ্র বাংলাদেশি শ্রমিকদের। যারা একদিন ফোন করে ইউরোপ নিয়ে যাবে বলে লোভ দেখিয়েছিল তাদেরকেই পাওয়া যায় তুরস্কে। মূলত এরা তুরস্ক থেকে ফোন করে গ্রিস বা ইতালিতে থাকে বলে জানিয়েছিল। এবার তারাই শ্রমিকদের ‘সেফ হোম’ রেখে একইভাবে বাড়িতে ফোন করে দাবি করে মুক্তিপণ। তুরস্ক সীমান্ত এলাকায় এমন বহু বাড়ি আছে, দালালরা যেগুলোকে ‘সেফ হোম’ বলে।



তুরস্কে এসে তাদের প্রিয়জন আবারও জিম্মি হয়েছে –এমন খবর স্বজনদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। এমন খবরে দিশেহারা হয়ে পড়েন স্বজনেরা। কিন্তু প্রিয় মানুষের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তাদেরকে আবারও বাধ্য করে টাকা দিতে। এরপরেই মেলে চূড়ান্ত মুক্তি। হতভাগ্য এই শ্রমিকদের বেশিরভাগই কোনো না কোনো উপায়ে দুর্ভোগ-দু:স্বপ্ন পেরিয়ে পৌঁছায় তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে। ইউরোপ আর এশিয়ার সংযোগস্থল এই শহরে কাজ খুঁজে নিয়ে সবকিছু নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করে তারা। সে চেষ্টা তাদের ভুলিয়ে দেয় দালালদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার তাগিদ। কেননা ততদিনে নিঃস্ব হওয়া পরিবারকে আবার স্বচ্ছল করে তোলার চেষ্টায় ব্যকুল হয়ে ওঠে এসব জীবনযোদ্ধা।



জানা যায়, একইভাবে শুধু ওমান নয়, ইউরোপে যাওয়ার জন্য মরুক্ক বা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ থেকেই শ্রমিকরা এভাবে দালালের সাহায্য নিতে গিয়ে তাদের খপ্পড়ে পড়েন। জিম্মি হয়ে সবাই তাদের শেষ সম্বলটুকু হারান। কেউ বা হারান জীবনটাই।

সকল জীবনযোদ্ধা প্রতি রইলো শুভ কামনা ।
কাওছার আহমেদ, ফ্রান্স থেকে

Related Articles

Close