আন্তর্জাতিকবিশেষ প্রতিবেদনমতামত

পুরো ভারত যেন এক টুকরো গুজরাট; মানবাধিকার থাকতেও নেই মুসলমানদের!







ভারত ক্রমেই অসভ্যতার দিকে ধাবমান হচ্ছে। তাদের থেকে মানবিক গুণাবলী হ্রাস পাচ্ছে। উগ্র হিন্দুদের হাতে একের পর এক ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার হচ্ছে সেখানকার মুসলমানরা। সম্প্রতি মুসলিম যুবক তাবরেজ আনসারী’র উপর র্নিমম নির্যাতনের চিত্রটি দেখেছে বিশ্ববাসী। হতবাক হয়ে সবাই দেখেছে একটি উগ্র জাতীর কর্মকান্ড।



আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী হয়েও সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর শুধুমাত্র ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। বিনা দোষে নিরপরাধ মুসলমানদের নির্যাতনের মাধ্যমে ভারত তাদের হীনমন্যতার পরিচয় দিচ্ছে। এমনটি তারা সেখানে রায়টের পরিবেশ তৈরি করছে। তাদের এই জুলুম-নির্যাতন বন্ধ না হলে সামগ্রিকভাবে যদি উপমহাদেশের রাজনীতিতে কোন বৈরি পরিবেশের সৃষ্টি হয় সেজন্য ভারতকে এর দায়ভার গ্রহণ করতে হবে। ভারতে নির্যাতিত মুসলমানদের বোবা কান্না নতুন নয়। দুর্দশার শেষপ্রান্তে নিক্ষিপ্ত ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে অনুপস্থিত। তাদের বোবা কান্নার আওয়াজ মানবতাবাদীদের কর্ণকুহরে কখনো পৌঁছে না।



দেশটিতে ধর্মীয় সহিংসতা বলতে মূলত মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বোঝানো হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতের বিভাজনের সময়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সহিংসতার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল, প্রায়শই হিন্দু জনতা দ্বারা মুসলমানদের উপর সহিংস হামলার আকারে ছিল, যা সংখ্যাগুরু হিন্দু ও সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একটি নকশা গঠন করে। ১৯৫০ সালের পর থেকে ১৯৫৪ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ৬৯৩৩ টি ঘটনায় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১০,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। (সূত্র : উইকিপিডিয়া) যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে।



কেবল ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় প্রায় ৫০০০ হাজার মুসলমানদের শহীদ করে দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিলো। সেই গুজরাট দাঙ্গায় উগ্র হিন্দুরা মুসলমানদের সাথে এমন কোনো অমানবিকতা নেই যা করেনি। মুসলিম নারীদের পেট কেটে ভ্রুণ থেকে সন্তান বের করে খুন করার মতো অমানবিকতাও তারা দেখিয়েছে। প্রায় ১০০০ হাজার নারীকে সে সময় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিলো। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তখনকার গুজরাটের মূখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় এই নারকীয় হত্যাকান্ড চালানো হয়েছিলো।

সেই নরেন্দ্র মোদিই এখন ভারতের প্রধান ক্ষমতায় আরোহন করে আছেন। পুরো ভারত যেন তিনি এক টুকরো গুজরাটে পরিণত করেছেন। ভারতের মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা যেন ২০০২ সালের সেই গুজরাটের মতো। তবে কেবল গুজরাটেই নয়; ভারতে মুসলিম নির্যাতনের এই ধারা অব্যাহত ছিলো ধারাবাহিকভাবেই।



ভারতের পুলিশরা ব্যাপকহারে মুসলিম বিদ্বেষী। মুসলমান হত্যায় তারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। ২০০২ সালের গুজরাটে দাঙ্গা তার অব্যর্থ প্রমাণ। ১৯৯৬ সালে ৩১৩ জন মুসলমানকে সিমি সদস্য বলে আটক করা হয়। অথচ তখন সিমির সদস্য সংখ্যা ছিল ১৩২ জন। ভারতের সংবাদ মাধ্যম সংবাদ সংগ্রহ করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সূত্র থেকে।

সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ বলা হয় সাংবাদিক প্রবীণ স্বামীকে। এদের প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বভাবত তা হয়ে ওঠে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী।



২০০৬ সালে সাচার কমিটির রিপোর্টে বলা হয়, পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য আইনজীবীর অভাবে ভুগছেন মুসলিম জনগণ। সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের ওপর অবৈধ পন্থায় বর্বর নির্যাতনের সংবাদ মাধ্যমে কোনোকালে ফুটে ওঠে না। সন্দেহভাজনদের জন্য টর্চার সেল কায়েম করা হয়। আইনবহির্ভূত কয়েদখানা তৈরি হয় তাদের জন্য। পুলিশ এনকাউন্টারের নামে তাদের হত্যা করা হয়। বেআইনী পুলিশ বর্বরতায় সাক্ষ্য-প্রমাণ লোপাট করে দেয়া হয়। এভাবেই বেপরোয়া হত্যা-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন ভারত জুড়ে নির্দোষ মুসলিম জনগণ শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে। কথিত মুসলিম সন্ত্রাসীদের নিয়ে ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সংবাদ মাধ্যমে গল্প রচনার জোয়ার দেখা দিয়েছে। অথচ ভারতের আনাচে-কানাচে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গণমাধ্যমে সেসব নির্যাতনের কোনো চিত্র পাওয়া যায় না। তারপরও আলোচিত কিছু ঘটনার দ্বারা বিশ্বব্যাপী মানুষরা বুঝতে পেরেছে ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের ভয়াবহতা। তেমন কয়েকটি ঘটনা উল্ল্যেখ করা হলো ;

(১) মে ২০০৮-এ ১৪ বছরের এক মুসলিম কিশোরকে তুলে নিয়ে যায় গুজরাট পুলিশ। বন্দুকের ডগায় গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দি-শিবিরে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ছেলেটির মায়ের দরখাস্তে সাড়া দিয়ে কোর্ট তার মুক্তির আদেশ দেয় এবং দশদিন পর ওই কিশোর মুক্তি পায়। আদালতে মোকদ্দমা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে ভয়াবহ পরিণতি ভুগতে হবে বলে ছেলেটির পরিবারকে পরে পুলিশ শাসিয়ে দেয়। ভারতীয় আইনজীবীরা মুসলিমদের পক্ষে মোকদ্দমা চালাতে প্রায়শই ইতস্ততঃ করেন। অবলম্বনহীন একটি জনসম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়।

(২) কর্ণাটক রাজ্যের সালেগাঁওয়ে একটি মুসলিম কবরস্থানে ২০০৬ সেপ্টেম্বরে বিস্ফোরণে নিহত হয় ৩৫ ব্যক্তি। হত্যাকান্ডের দোষ সংবাদ মাধ্যম মুসলমানদের ঘাড়ে চাপায়। হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে মারা যান ১০ জন মুসলমান। প্রবীণ স্বামী নির্বিচারে দোষ চাপিয়ে দেয় কথিত মুসলিম সন্ত্রাসীদের ওপর। ভারতীয় শহরগুলো ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের খপ্পরে চলে গেছে- এমন মন্তব্যও ছড়িয়ে দেন প্রবীণ স্বামী। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্তে প্রকাশ পায় সালেগাঁওয়ে ও মক্কা মসজিদে হামলা চালিয়েছিলো উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদীরা।

(৩) তাবরেজ আনসারী নামের ২৪ বছরের এক মুসলিম যুবক, ভারতের বনাখন্ডের জামশেদপুরের খার সাওয়ান্দ সারাই বেলাতে তার নিবাস। ‘স্থানীয়রা রোববার চোর সাব্যস্ত করে ওই যুবককে। তাকে বেদম মারপিট করা হয়। এরপর তাকে রোববার সকালে ভর্তি করা হয় সদর হাসপাতালে। সেখান থেকে তাকে স্থানান্তর করা হয় জামসেদপুরের টাটা মেইন হাসপাতালে। তার পরিবারের দাবি, তার ওপর যে হামলা হয়েছে তা সাম্প্রদায়িক। তাকে জয় ‘শ্রী রাম’ এবং ‘জয় হনুমান’ স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়েছে। পরিবার আরো বলছে, কিছু মানুষ তাবরেজকে প্রচন্ড মারপিট করে। পরে তাকে তুলে দেয় পুলিশে। চুরির সন্দেহে তার সঙ্গে এমন আচরণ করা হলেও সে সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার। তাকে মরপিট করা হয়েছে সে একজন মুসলিম বলে।“বারবার তাবরেজকে ‘জয় শ্রীরাম’ ও ‘জয় হনুমান’ স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়েছে। তাকে হাসপাতালে দেখতে যেতে চাইলেও আমাদের (আত্মীয়দের) অনুমতি দেয়া হয়নি।

“ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি কাতর কণ্ঠে বলতে থাকেন, আমার মা মারা গেছেন। তার নামে শপথ করে বলছি, আমি এমন কাজ করিনি।”

(৪) “একটি মাইক্রোবাস থামিয়ে নিরীহ একজন দাড়ি-টুপিওয়ালা লোককে সাম্প্রদায়িক যুবকরা চর-থাপ্পর মারছে। বলছে, বল, জয় শ্রীরাম। লোকটি প্রাণের ভয়ে ভয়ে ‘শ্রী রাম’ বললেও কিল, চড় ও গালি থামছে না। অপর এক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে সত্তর বছরের এক বৃদ্ধকে এমনভাবে সাম্প্রদায়িক যুবকরা মারধোর করছে যেমনটি মানুষ সন্ত্রাসী চোরকেও করে না। একপর্যায়ে রক্তাক্ত ও আহত এ বৃদ্ধকে শূকরের মাংস খেতে বাধ্য করা হয়।’

(৫) “ত্রিপুরায় সবচেয়ে ধনী মুসলমানের বাড়িটিকে শত শত সাম্প্রদায়িক লোক লুটপাট করে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। প্রতিদিন বহু বাড়িঘর ও দোকান হয় জ্বালিয়ে দেয় হচ্ছে, নয়তো ভেঙে তছনছ করে দেয়া হচ্ছে। দু’তিনজন শ্রমিক শ্রেণীর লোককে বিজেপির কর্মী, আরএসএস এবং বজরাঙ্গী ইত্যাদি নামধারী কিছু যুবক নির্মমভাবে জুতাপেটা, কিলঘুষি, লাথি এমন কি লাঠিপেটা করছে। তাদের অপরাধ- এসব হতদরিদ্র ভুখা নাঙ্গা শ্রমিকরা নাকি গরুর গোশত খেয়েছে।’ (সূত্র : ইনকিলাব)

দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাতে লেখা হয়েছে- “ভারতের গত নির্বাচনের বহু আগ থেকে যে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা কিছু নেতা সৃষ্টি করেছিলেন নির্বাচনের পরেও তা যথারীতি চলছে। ….এসব নেতার ইঙ্গিত আছে বলেই পরিস্থিতি নির্বাচন চলে যাওয়ার এত পরেও শান্ত না হয়ে দিন দিন বরং আরও উত্তপ্ত হচ্ছে।’ স্যোশাল মিডিয়ায় দেখবেন, কোনো মুসলিম বাড়িতে বজরং দল কিংবা আর এস এস নামধারী যুবকরা প্রবেশ করে বাড়ির নারী-পুরুষ-শিশুকে নির্মমভাবে পেটাচ্ছে। ঘরের দরজা এঁটে দিনে-দুপুরে শ্লীলতাহানি করছে নারীদের। ঠিক গুজরাতের নৃশংসতার মতো, সেখানে হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল। মুসলিম এমপিকে তাঁর বাসায় গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক গুন্ডারা প্রকাশ্যে রাজপথে মুসলিম নারীদের ধর্ষণ করে। নিজেদের লোক দিয়েই ভিডিও ধারণ করেছিল। আজকের প্রধানমন্ত্রী মোদি তখন গুজরাটের দায়িত্বে ছিলেন। যে পুলিশ কর্মকর্তা গুজরাটের ঘটনার জন্য দায়ীদের চিহিৃত করে রিপোর্ট দিয়েছিলেন তিনি এখন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি।”

‘আমরা ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র দাবি করি’। আমাদের কথা ভারতের বিরুদ্ধে নয়, ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন তাদের ধর্মীয় অধিকার মানবাধিকার দলন, হরণের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি ভারত সফরে এসে দেশটিতে সংখ্যালুদের উপর নির্যাতন ও সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও। তিনি বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করা মানে বিশ্বকে খারাপ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেয়া পম্পেওর এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ গত সপ্তাহে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা শীর্ষক রিপোর্টে বলা হয়, ভারতে বিশেষত মুসলমানরা চরমপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গরুর মাংস খাওয়া ও রাখা নিয়েও হিংসার বলি হতে হচ্ছে তাদের। এই পরিস্থিতিতে ভারতের অন্যতম বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিবের এই বার্তা হালকা করে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। যদিও, রিপোর্ট প্রকাশের পরই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল।

আর এবার পম্পেও খোদ ভারতে এসে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে বুঝিয়ে দিলেন, ভারত ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও ধর্মীয় সহিংসতার বিষয়ে তারা কঠোর অবস্থানেই থাকবেন। পম্পেওর এর এই বক্তব্যকে আমরা সাধূবাদ জানাই। তার কথায়, ‘বিশ্বের ৪টি বহুল প্রচলিত ধর্মের জন্মভূমি ভারত। আসুন সবাই মিলে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে একজোট হই। সবাই মিলে ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য উঠে দাঁড়াই। না হলে এ বিশ্ব সুন্দর থাকবে না।’

প্রতিবেশি এই রাষ্ট্রটির জন্য আরেকটি ভয়ানক তথ্য হলো নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান। ভারত যে ক্রমেই মানুষ বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে এর প্রমাণ হলো : “নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ভারত’’ সংবাদটি। নারীর জন্য বিপজ্জনক দেশের তালিকায় সবার উপরে রয়েছে দেশটি। সম্প্রতি নারীর জন্য বিপজ্জনক ১০টি দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান থমসন রয়টর্স ফাউন্ডেশন। ছয়টি মানদণ্ড নির্ধারণ করে জাতিসংঘের ১৯৩ দেশে এই জরিপ চালনো হয়। এশিয়ার ছয়টি, আফ্রিকার তিনটি এবং উত্তর আমেরিকার একটি দেশের নাম তালিকায় আসে। জরিপে এ বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৪ মে পর্যন্ত পৃথিবীজুড়ে নারীদের পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা মোট ৫৪৮ জন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অনলাইনে, ফোনে এবং সরাসরি কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

যেসব বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে তারা দীর্ঘ দিন থেকে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া এবং প্রশান্ত এলাকায় নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। এদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, সরকারের নীতি-নির্ধারক, স্বাস্থ্যকর্মী, এনজিও কর্মী, উন্নয়ন ও সহায়তাকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধি।
জরিপে মানদন্ডগুলো ছিল— স্বাস্থ্যসেবা; অর্থনৈতিক অবস্থান বা সম্পদের পরিমাণ; সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী কাজে অংশগ্রহণ; যৌন সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন; সহিংসতা (যৌন নির্যাতন ছাড়া) ও মানবপাচার। বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারীদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক দেশ ভারত। এখানে নারীদের ওপর সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতন হয়। ক্রীতদাস হিসেবে নারীর ব্যবহারও এখানে বেশি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নারীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি যৌন সহিংসতা।

২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ডের কথাই মনে করিয়ে দেয় নারীর জন্য কতটা বিপদজনক এই দেশটি। ২৩ বছরের তরুণীকে রাতে বাসে একা পেয়ে চালক এবং অন্যান্য যাত্রীরা ধর্ষণের পর হত্যা করে। নারীর প্রতি অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে দেশটিতে।

সরকারি হিসাব অনুয়ায়ী, ২০০৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত নারীর সঙ্গে হওয়া অপরাধের মাত্রা আগের বছরগুলোর তুলনায় শতকরা ৮৩ ভাগেরও বেশি বেড়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায়, এই বছরগুলোতে ভারতে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ভারতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিপক্ষে সচেতনতা বাড়লেও খুব একটা লাভ হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর কারণ হলো প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা বদ্ধমূল নানা প্রথার চর্চা। এসবের মধ্যে রয়েছে কন্যা শিশুহত্যা, গৌরি দান, যৌনদাসত্ব, পারিবারিক ক্রীতদাসত্ব বা অধীনতা, মানবপাচার এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা।

ভারতের নির্যাতিত নিপিড়িত মুসলমানদের পাশে দাড়ানো দায়িত্ব আমাদের। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের সোচ্চার হওয়া উচিত ভারতের এই অন্যায় অবিচার ও মুসলমানদের মানবাধিকার লঙ্ঘণসহ ধর্মীয় স্বাধীনতা বিনষ্ট করার বিপরিতে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘ইন্নামাল মুমিণূনা ইখ্ওয়াহ-ফআস্লিহু বাইনা আখ্ওয়াইকুম’ (মুসলমানরা পরস্পরে ভাই ভাই। তোমরা তোমাদের ভাইদের পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য স্থাপন করে দাও) বিশ্বনবী (সা.) বলেন, মুসলমানরা পরস্পরে ভাই। সে তার প্রতি জুলুম করবে না এবং তাকে শত্রুর নিকট সমর্পণ করবে না। যে মুসলিম অপর মুসলিম ভাইয়ের বিপদ-দূর করার চেষ্টা করে আল্লাহতায়ালা তার বিপদ দূর করে দেন। যে মুসলিম অপর কোন মুসলিম ভাইয়ের একটি কষ্ট দূর করে দেন আল্লাহপাক কিয়ামতের কষ্টসমূহের তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। (বুখারী ও মুসলিম)

প্রিয়নবী (সা.) আরও বলেন, দুনিয়ার মুসলমান মিলে একজন মানুষের মত। যদি তার চক্ষু যন্ত্রণাপ্রাপ্ত হয় তবে তার সর্বশরীর যন্ত্রণা প্রাপ্ত হয়। এরূপ যদি তার মাথা আক্রান্ত হয় তবে তার সর্বশরীর যন্ত্রণায় অধীর হয়। অর্থাৎ দুনিয়ার প্রায় দুইশ কোটি মুসলমান কেবলমাত্র একটি জাতি, মিল্লাত বা উম্মাহ নয়। সবমিলে একটি দেহ। এই দেহের কোন একটি অঙ্গ যদি আঘাত প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ দুনিয়ার কোথাও একটি মুসলমানও যদি আক্রান্ত হয়, আঘাত প্রাপ্ত হয় তবে দুনিয়ার প্রতিটি মুসলমানেই সে যন্ত্রণা অনুভব করবে এবং সেই যন্ত্রণা, সেই কষ্ট দূর করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। যতক্ষণে না সেই যন্ত্রণা দুরীভূত হয় সে চেষ্টা চালিয়ে যাবে। অব্যাহত রাখবে। এই হলো মুসলমানের সংজ্ঞা বা পরিচয় প্রশ্ন হল সেই পরিচয় আমরা কি দিতে পারছি।’ যেখানে আমাদের ভাইয়েরা লাঞ্ছিত হচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, মার খাচ্ছে, খুন হচ্ছে, প্রাণ হারাচ্ছে, আমাদের মা বোনরা নরপিচাশদের হাতে নিগৃহিত হচ্ছে, আব্রু ইজ্জত হারাছে, ধর্ষণ, গণধর্ষনের শিকার হচ্ছে। তা প্রতিহত করার জন্য উম্মাহ হিসাবে আমরা কি সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করছি? এ সমস্যা ও প্রশ্ন দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে যা ঘটছে তাতে আবার নতুন করে এ জিজ্ঞাসা তীব্র আকারে সম্মুখে এসেছে।

লেখক : মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী, সদস্য সচিব-জালালাবাদ লেখক ফোরাম।

Related Articles

Close