যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান

0

বিয়ানীবাজার ভিউ২৪ ডটকম, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,

সাম্প্রদায়িক বিরোধে জ্বলছে পুরো বিশ্ব। বাংলাদেশেও মাঝেমাঝে মাথাছাড়া দিয়ে উঠে সাম্প্রদায়িকতার আগুন। তবে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় গিয়ে দেখা মিললো অসাম্প্রদায়িকতার অনন্য দৃষ্টান্ত।

এই উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানের একটি সমাধিক্ষেত্র। একই সমাধিক্ষেত্রে সব ধর্মের মানুষকে সমাহিত করা হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। এখানে এক মাঠে ওয়াজ হয় কীর্তন হয় আবার বড়দিনের অনুষ্ঠানও হয়। কীর্তনে হুজুর উপস্থিত হন আবার তাফসিরে পুরোহিত। এ যেনো নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতারও বাস্তব রূপ।

পাত্রখোলার সমাধিক্ষেত্রে হিন্দু, খৃস্টান ও মুসলিম প্রধান প্রধান এই ধর্মের মানুষকেই সমাহিত করা হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। সমাধিক্ষেত্রে নেই কোন বিভাজক দেয়াল। কেবল পাকার খুটি দিয়ে চিহ্নত করা হয়েছে ধর্মীয় সীমানা। বর্তমানে হিন্দু, খৃস্টান ও মুসলিম এই তিন ধর্মের মানুষকেই সমাহিত করা হয় প্রায় পাঁচ একর আয়তনের বিশাল এই সমাধিক্ষেত্রে।

ব্রিটিশ আমলে দেশের সীমান্তবর্তী পাত্রখোলা চা বাগানের এই সমাধিক্ষেত্রটি গড়ে ওঠে। প্রথমদিকে শুধু হিন্দু ও খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের এখানে সমাধিত করা হতো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সবার আলোচনার ভিত্তিতে মুসলিম কবরস্থানটিও স্থানান্তর করে এখানে নিয়ে আসা হয়।

স্থানীয়রা জানালেন, জমি সংকট কিংবা কোন প্রতিবন্ধকতায় জন্য এমনটি হয়নি বরং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা নেয়ার উদ্দেশ্যে এটি তৈরী হয়েছে।

সমাধিক্ষেত্রে তিনটি নামফলক রয়েছে। সনাতন ধর্মের মাখন চাষা, মুসলিম র্ধমের সেলিনা আক্তার, খ্রিষ্টান ধর্মের ফিলিমন বিশ্বাসের নামফলক জানান দিচ্ছে এই সমাধিক্ষেত্রের সার্বজনীনতা। পাত্রখোলা সার্বজনীন সমাধিক্ষেত্রে তারা খুব কাছাকাছি চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন এই তিনজন।

স্থানীয়রা জানান, হিন্দু মুসলিম খৃস্টান সব ধর্মের মানুষ কমলগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই এলাকায় সাম্প্রদায়িক বিষ থেকে মুক্ত হয়ে মিলেমিশে আছেন যুগ যুগ ধরে।

স্থানীয় মসজিদের ইমাম আব্দুল আজিজ, মন্দিরের পুরোহিত রাজেশ পন্ডিত ও গির্জার ফাদার তারা ভালো বন্ধু।

ধর্মীয় গোড়ামীর বিপরীতে সকল ধর্মের মানুষের সম্প্রীতি ও সমর্থনে গড়ে ওঠা এই সমাধিক্ষেত্র নিয়ে গর্বিত এলাকাবাসী । তাদের একজন মাওলানা বাছিত খান জানান, এখানে যুগ যুগ ধরে হিন্দু, বৌদ্ধ, খিষ্টান ও মুসলিমদের সমাধী গড়ে উঠার ফলে আমাদের মধ্যে সুসর্ম্পক জোড়ালো হয়েছে।
চা শ্রমীক গৌরব উড়াং বলেন, জাত ধর্ম দিয়ে আলাদা করে কে? এখানে লাশ শুয়ে আছে সাহেব লাশ । আমার বাপ-দাদা, কাকা-জেঠা যেমন শুয়ে আছে তেমনি পাড়ার বন্ধু, পাশের বাড়ির চাচাও শুয়ে আছে।

পাত্রখোলা চা বাগান সার্বজনীন পূজা মণ্ডপের পুরোহিত রাজেশ পণ্ডিত বলেন, ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন আমাদের এই বন্ধন থেকে শিক্ষা নিয়ে ধর্মীয় হিংসা মুক্ত সমাজ অব্যহত রাখে সেটাই আমাদের স্বপ্ন।

পাত্রখোলা চা বাগান জামে মসজিদ ইমাম মো: আব্দুল আজিজ বলেন, আমাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না বরং আমরা গর্বিত এমন মিলেমিশে থাকতে পারছি বলে। সমাজের সব ধর্মের মানুষ একে উপরকে ভালবেসে একসাথে থাকতে পারলে তবেই সমাজের শান্তি আসবে।

Share.

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.