ইফতারি: রমজানে প্রচলিত একটি অমানবিক প্রথা

0

বিয়ানীবাজার ভিউ২৪ ডটকম, ২১ মে ২০১৮,

ইফতার সুন্নত। রোজাদার কোন ব্যাক্তিকে ইফতার করানো নি:সন্দেহে ছওয়াবের কাজ। সমস্তদিন কোন ব্যক্তি রোজা রেখে ইফতাররের মাধ্যমে যে ছওয়াব অর্জন করেন, ঠিক সমপরিমাণ ছওয়াব সে অর্জন করতে পারে অন্য রোজাদার মানুষকে ইফতার করানোর মাধ্যমে।

যদি আমাদের কারো সামর্থ থাকে এবং কোন রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানোর সুযোগ পাই, তাহলে, সুযোগটি আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আমাদের সমাজে এই সুযোগটিকে অনেকে লোক দেখানো, নাম কামানো তে ব্যবহার করেন। যা খুবই দূ:খজনক।

বিশেষ করে সিলেট ও চট্রগ্রাম বিভাগে ইফতার করানোর নামে ‘ইফতারী‘ দেয়া একটি ব্যাধিতে রুপান্তরিত হয়ে গেছে। এখানে একটি প্রথা প্রায় চালু আছে যে, কারো সামর্থ থাকুক আর না-ই থাকুক, প্রতি বছর রমজান মাস আসলে মেয়ের বাড়ী ইফতারী দিতেই হবে। না দিলে যেন ইজ্জত যায়! অর্থাৎ এখানে ইফতার দেয়াকে সামাজিক দ্বায়িত্ব এবং গ্রহন করাকে গৌরবের ভাবা হচ্ছে। যদিও ঢালাও ভাবে এই কথাটি সবার জন্য সঠিক নয়।

এখানে দেয়া-নেয়ার মধ্যে ছওয়াবের কোন চিন্তা কাজ করে না। আমি যে কাজটি নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সম্পাদন করছি, তা ছওয়াবের চেয়ে যদি পাপ হয় বেশী অথবা সমাজে ব্যাধিতে রুপান্তরিত হয়, তাহলে সে কাজটি করার পূর্বে একটি বার ভেবে দেখা উচিত।

রমজানের মাস সংযমের মাস।এ মাসে আমাদের সকল প্রকার খারাপ কাজ থেকে সংযত থাকতে হয়। আমাদের ভেবে দেখা উচিত, আমরা কতটুকু তা করছি বা করতে চেষ্টা করছি। আমাদের সমাজে সিংহভাগ মানুষ নিন্মমধ্যবিত্ত অথবা দরিদ্রসীমার নীচে বাস করে। সমাজের এই মানুষগুলোই ইফতারী দেয়ার প্রথাকে সম্পাদন করতে কত যে হীমসিম খাচ্ছে – তা ভেবে দেখা উচিত। আমাদের সমাজে উচ্চবিত্ত অথবা মধ্যবিত্তরা এই ইফতারী প্রথা বাস্তবায়ন করতে মেয়ের বাড়ী ইফতার পাঠায় তখন ছওয়াব থাকে গৌন। এখানে স্বামীর বাড়ী মেয়ের ইজ্জত বৃদ্ধিসহ জামাই, শশুর,শাশুড়িকে বেশী খুশী করতে যতটুক ইফতারী প্রয়োজন তার চেয়ে তিন-চারগুন বেশী ইফতারী নিয়ে মেয়ের বাড়ীতে অনেকে হাজির হন। স্বাভাবিক ভাবেই এইসব ইফতারী বহন করতে ঠেলাগাড়ি থেকে শুরু করে ট্রাক পর্যন্ত ব্যবহার হয়। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই ঠেলা গাড়ি, ট্রাক ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় মূলত জামাইর বাড়ির আশপাশের লোক দেখানোর জন্য-ই করা হয়ে থাকে।

আমরা যারা ইফতারী প্রথা সমর্থন করি, এটাকে সমাজে বেশ ভালো ভাবেই প্রচলন রেখেছি । সর্বপরি মেয়ের জামাইর বাড়ীর অন্যায় আবদার বা মেয়ের বাড়ীর লোকজনকে খুশী রাখতে কাজটি করছি। তারা কি একবার ভেবে দেখেছেন যে, আমাদের আশপাশের হতদরিদ্র কন্যার বাবা বা অন্যদের কী রকম মানষিক,আর্থিক ও সামাজিক বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? পাশের বাড়ির হতদরিদ্র বাবা যে দিনে আনে দিনে খায়। তার মেয়ে ও তো এই সমাজের ই একজন। তারও তো সমাজ আছে। ইচ্ছে, আকাঙ্খা আছে। মান মম্মান আছে। আপনি সমাজ রক্ষার্থে নিজের টাকা অপচয় করে যে কাজটি সম্পাদন করছেন ; একবার কী ভেবে দেখেছেন আপনার পাশেই বাসকরা সেই অসহায় বাবা তথাকথিত এই প্রথাটি বাস্তবায়ন তার পক্ষে কি সম্ভব? যদি সম্ভব মনে না করেন, তাহলে তো আপনাদের দৃষ্টিতেই এটি একটি ভালো উদ্যোগ বা প্রথা বলে মেনে নেয়া যায় না। যে প্রথা সমাজে আনন্দ কেড়ে নেয়, গরীব নিপীড়ীত মানুষের দূ:খ বাড়ায় ; তা কখনও, কোন কালেই সমাজের কল্যাণ কর কাজ হতে পারেনা।

একজন দিন মজুরের যদি ৩/৪ জন মেয়ে থাকে এবং তার উপর যদি সামাজিক ইফতারী প্রথা বাস্তবায়ন এর জন্য এক প্রকার সামাজিক দায় এসে পড়ে, তাহলে সেটা ছওয়াবের বদলে কতটুকু অন্যায় অত্যাচার বলে মনে হয়? ধরুন, গরীব এই পিতা সামাজিক প্রথার কারণে তাঁর ৩/৪জন মেয়ের বাড়িতে ধার করে ইফতারী দিলেন, তাহলে, সে কত দিনে তার এইধার করা টাকা পরিশোধ করা সম্ভব?যেখানে তার কোন বাড়তি আয়েরই সম্ভাবনা নেই।

আমার দৃষ্টিতে এই ইফতারী প্রথা ছওয়াবের ধার-পাশেও নেই। এটি কন্যার পরিবারে প্রতি একটা চরম অমানবিক ও অন্যায়। একটি চাপিয়ে দেয়া কাজ। অনেক বড় একটি জুলুম। এবং এর পেছনে, আরেকটি পুরুষতান্ত্রিক একপেষে নিয়ন্ত্রণ মূলক মন-মানষিকতাও কাজ করে।

নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি- যুগ যুগ ধরে চলা এই প্রথা চলছে শুধু মাত্র মেয়ে পক্ষই মেয়ের জামাই এর বাড়ী পক্ষে দিয়েই। অর্থাৎ এটা শুধু মাত্র মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে তার স্বামীর ঘরেই দেয়া হয়ে থাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে। প্রথাটি কিন্তু উভয় পক্ষের জন্যও প্রচলিত নয়। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে- মেয়ের পক্ষ স্বজ্জন বা মানবিক হলে, ছেলে পক্ষকেরও তো হওয়া উচিত ছিল।

প্রাসঙ্গিক একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। ১৯৯৩ বা ১৯৯৪ সালের ঘটনা। সিলেট বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ বাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্তৃক আয়োজিত ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ এর যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালিক মায়ন। সভায় এক সময় আমাকে বক্তৃতা দেবার জন্য ডাকা হয়। আমি যথারীতি বক্তৃতা রাখি; যা ছিল রাজনৈতিক। আমার বক্তৃতা শেষে সভা থেকে একটু দূরে গিয়ে দাড়িয়েছি, গরম অবহাওয়ায় মনে হয়েছে সভা থেকে বের হয়ে একটু গাছের ছায়ায় বসি। লক্ষ্য করি, ধীরে পায়ে আমার দিকে ছুটে আসছেন একজন মুরব্বী। বয়স অনুমান সত্তরের কাছাকাছি হবে। কোশল বিনিময়ের পর আমাকে বললেন আঞ্চলিক ভাষায় বললেন- ‘বাবা এই সমস্ত বক্তৃতায় আমাদের কী লাভ হবে। আমরা যে সমস্যায় জর্জরিত তা আপনারা বলেন।‘ জিজ্ঞেস করলাম – ‘চাচা, আপনাদের সমস্যা কী? উত্তরে তিনি বললেন-‘এই যে রমজান আসলে ইফতারী সমস্যা। এই সমস্যা আমাদের গরীবদের জন্য এখন একটি বিরাট সমস্যা, বাবা। এটা রোধ করার জন্য আপনারা কথা বলুন। এখানে ইফতার মাহফিল এর সময় অন্তত কিছু মানুষ শুনবো।‘
আমি মনে সত্যিকার অর্থেই একটা ধাক্কা খেলাম। চাচার কথা বিনয়ে শুনছি এমন ভাবে যে, তিনি যেন তাঁর মনের কথা গুলো আমাকে সহজে বলতে পারেন। এরপর বললেন- ‘আপনারা পারবেন। আপনারা বিভিন্ন সভায় মানুষের সামনে কথা বলেন। আপনারা বললে মানুষ এই ইফতারী প্রথা বন্ধ করবে। আমরা গরীবরা কিছুটা বাচঁবো।‘

আমি মুরব্বীকে আশ্বস্থ করলাম এই বলে যে,- ‘এখন থেকে, এই প্রথা বন্ধ করতে সব সভায় কথা বলবো।’ মুরব্বীকে বিদায় দিয়ে ভাবলাম –আসলেই আমরা যে গথবাঁধা বক্তৃতা করি, তা কিন্ত দৈনন্দিন মানুষের যে সমস্যা তা রোধ হবার নয়। বিএনপি কে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে আওয়াশী লীগ ক্ষমতায় আসলে আমাদের সমাজের ইফতারী সমস্যা সমাধান হবে না। আমাদের রাজনীতি হওয়া উচিত মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা গুলো চিহ্নিত করে;তার উপর আলোচনা- সমালোচনা করে। এবং সে থেকেই আমাদের রাজনীতিবিদদের সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরী।

পরক্ষণে ভাবনায় আসে যে, যে প্রথা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে আজ হুট করে কি তা রোধ করা সম্ভব? মানুষ কি আমার কথায় তা বন্ধ করে দেবে? নিশ্চয় করবে না। হয়তো, এখানে আমার ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ অথবা রাজনীতির কোন গন্ধ খুজতে চাইবে! গরীব কন্যার পিতা, মেয়ের সুখের দিকে চেয়ে শতকষ্ট করেও তা চালিয়ে যাবে। কিন্তু ভাবনায় আসে ,আমরা যারা পুরুষ, যারা একজন নারীই সন্তান। যে নারী আমার মা। আর মায়ের সম্মানে যদি আমরা যুগ যুগ থেকে চালিয়ে যাওয়া জুলুমকে যদি না বলি তাহলে তো এই সমস্যা থেকে মুক্তির সহজ পথ হবে। কিন্তু কোন পুরুষকে বলবো?

পুরুষ শাষিত সমাজে আমরা সবাই তো শাসকের ভূমিকায় আছি। নারীর দূর্বলতার সুযোগে আমরাই তো মহা আনন্দে আছি। তারপরও, চাচার কথাগুলো কানে বাজছে সারাক্ষণ। কাউকে না কাইকে তো দাড়াতে হবে। আর দাড়াতে হবে ছেলে পক্ষকে। ছেলের পক্ষ থেকে যদি এই প্রথা বিরোধী না হওয়া যায়, কোন সুফল আসবে বলে মনে করিনা।

আমরা কোন ছেলের মা। অথবা বাবা। কারো স্বামী। আমরা যদি এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে দা্ড়াই আমরা যদি বলি এই অপচয় ও অন্যায় হতে দেবো না। অথবা ইফতারী নামে কাউকে অত্যাচার করবো না। তাহলেই পারবো আমরা সমাজ থেকে এই তথাকথিত প্রথা বন্ধ করতে। আমি এই সমাজের একজন। আমি এই জুলুমের বিরুদ্ধে শপথ নিয়েছি। এ ধরণের কাজকে প্রশ্রয় দেবোনা। আর আপনি যে আমার বন্ধু, শুভাকাঙ্খি আপনিও এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাড়ান। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই জুলুম থেকে সমাজকে মুক্ত করতে।

আজ থেকে প্রায় পচিঁশ বছর পূর্বে আমাদের সমাজের সেই বৃদ্ধ লোকের আহাজারি আমার হ্যদয়ে স্পর্শ করে আছে। আমি তখনই শপথ নিয়েছি যে, কোন দিন বিবাহিত জীবনে আবদ্ধ হলে, আমার স্ত্রীর পক্ষ থেকে রমজানে ইফতার ও আমকাঠালী প্রথার বিরুদ্ধেই আমার অবস্থান হবে। আমি এই সব গ্রহন করবো না। ২০০০ সালে আমি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। আমার স্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে এই ধরণের আনুষ্ঠানিকতা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করি। সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রথা কি আর অনুরোধে আটকা পড়ে! একদিন আমার অজান্তে বিশাল ইফতারী নিয়ে হাজির হন শশুর পক্ষ। আমি বিনয়ে তাদের ভবিষ্যতে এই ধরণের আয়োজন থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করি। প্রতি উত্তরে তাঁদের কাছ থেকে শুনতে হয় -সমাজে চলে আসা সেই ইফতারী প্রথার কথা। তাঁদের বিনয়ে বলি – সমাজ ও প্রথা সবই এই সমাজের মানুষেরই সৃষ্টি। যে প্রথা, আমাদের কষ্টের কারণ, সে প্রথা আমি বাস্তবায়ন করতে পারিনা।

তাদেরকেও বুঝিয়ে বলি -এই ইফতারি প্রথা বাস্তবায়নে আমাদের সমাজের হত দরিদ্র মানুষ কীরকম কষ্টের মধ্যে পতিত হয় , তা আপনাদের মতো সমাজ সচেতনদের উপলব্দিতে আসলে অনেক লাভ হবে। সমাজে আলোকিত মানুষ হিসাবে আপনাদের একটি গ্রহন যোগ্যতা আছে এবং এর বিরুদ্ধে আপনারা সোচ্চার হলেই এর একটি শক্ত প্রতিবাদ হবে। অন্যরাও প্রতিবাদ করবে। গরীব বাঁচবে। সুখের বিষয়, আমার কথা তাদের উপলব্দিতে আসে এবং দীর্ঘ ষোল বছর থেকে আমার শশুর পক্ষ এই প্রথা চর্চা থেকে বিরত আছেন।

আমরা যারা বন্ধু, শুভাকাঙ্খি, যারা সমাজ সচেতন, অনেক ভালো ভালো কাজ করি। সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ এই রমজান থেকে ইফতারি প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। ইফতারী প্রথাকে ‘না‘ বলি। এবং এই কাজটা আপনার থেকেই শুরু করুন এবং সবাইকে জানিয়ে দেন, কেন আপনি এই জুলুমের ইফতারি প্রথা সিয়াম সাধনার মাসে করছেন না। সবাইকে বুঝতে দিন, কেন, গরীব মানুষের অন্যতম কষ্টের প্রথাটিকে সবার ‘না‘ বলা দরকার। এর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদী হওয়া দরকার।

সবাইকে রমজান মাসের শুভেচ্ছা। ধনী-গরীব ভেদাবেদহীন রমজান বিশ্বে শান্তি-সমৃদ্ধি বাড়িয়ে এবং ধনী-গরীব বৈষম্য কমিয়ে আনুক-প্রাথনা করছি।

মো. ছরওয়ার আহমদ। সংগঠক, সোস্যাল একটিভিষ্ট, বিয়ানীবাজার সরকারী কলেজ এর ভিপি -১৯৯৫-১৯৯৬ সাল। লন্ডন।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.