মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে মঞ্চে ওঠেন ‘সুন্দরবনকে উইশ’ করা লাবণী

0

‘তোমাকে যদি তিনটি উইশ করতে বলা হয়, সে উইশগুলো কি হবে এবং কাকে উইশ করতে চাও?’ মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের গ্র্যান্ড ফিনালের মঞ্চে বিচারক ইমির এমন প্রশ্নে মেয়েটা যে উত্তর দিল তা হতাশজনক। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সি-বিচ কক্সবাজার, সুন্দরবন এবং পাহাড়-পর্বতকে উইশ করতে চান ওই প্রতিযোগী।

কী অদ্ভুত, কী অদ্ভুত। সব গেল সব গেল… সোশ্যাল মিডিয়ার ‘অস্থির মানুষ’ আর কিছুই জানতে চাইল না আর ক’জন ট্যালেন্টেড বা ক’জন ভুল-ভ্রান্তি করেছে- এসব জেনে কী হবে। ভুল যেটুকু হয়েছে সেটা নিয়েই সমালোচনা চলতে থাকুক। ভাইরাল হোক। আসলে নেপথ্যে অনেক গল্প থেকে যায়। এসব গল্প সামনে আসে না কারণ এসবে রস নেই, মজা নেই। তারপরেও সুন্দরবনকে ‘উইশ’ করা প্রতিযোগী মেয়েটির গল্প সামনে নিয়ে আসতে চাচ্ছি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একজন শিক্ষার্থীর ‘উইশ’ না জানাটা একটা বিষয়ই বটে।

যেদিন তাকে নিয়ে ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে চলছে তুমুল হাস্যরস, সেদিন ওই প্রতিযোগীর জীবনে সবচেয়ে করুণতম ঘটে ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। রোম যখন পুড়ে যাচ্ছিল নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল। যাকে নিয়ে চলছে সমালোচনা অন্যদিকে সে তার মৃত্যুর মুখে থাকা মা’কে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। লাবণীর সাথে ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানা গেল মর্মান্তিক ঘটনা।

রাজবাড়ীর পাংশার মেয়ে লাবণী। মায়ের দুটো কিডনি নষ্ট। বার্ডেমে ভর্তি তিনি। প্রতিদিন চারবার করে ডায়ালিসিস করতে হয়। বাবা রাজবাড়ীতে থাকেন, ব্যবসা করেন। সেখান থেকে টাকা পাঠান, মায়ের চিকিৎসা চলে। মায়ের পাশে থেকে সব সময় সেবা করেই সময়টা কাটছিল। ক্লাস, পরীক্ষা আর মায়ের পাশে। মা ঘুমিয়ে থাকলে দীর্ঘ অবসরে ফেসবুকে সময় অতিক্রম। এভাবেই মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের সন্ধান। মা’কে দেখান বিষয়টা লাবণী। মা চান লাবণী প্রতিষ্ঠিত হোক। মা বললেন, ‘তোর আত্মবিশ্বাস থাকলে চেষ্টা করে দেখ। আমি অনেকদিন ধরে অসুস্থ, এই অসুখ আমার কতদিন থাকবে, ভালো হব কি-না জানি না। তুই পরীক্ষা ক্লাস মিস দিস না।’

লাবণী রেজিস্ট্রেশন করে ফেলেন। ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার লাবণী। পরপর চারটা রাউন্ড পার হয়ে ফাইনাল রাউন্ডে আসেন। সুন্দরী প্রতিযোগিতার গ্রুমিং, মা-ভার্সিটি, ক্লাস-পরীক্ষা। এসব নিয়ে এক যুদ্ধময় সময় কাটাচ্ছিলেন লাবণী।

লাবণীর ভাষায়, এভাবেই মা’কে রেখে আমি গ্রুমিং ক্লাস করতে যেতাম যার কারণে সব সময় যেতে একটু দেরি হতো। বাবা যদি মায়ের কাছে চলে আসেন তাহলে চিকিৎসার জন্য টাকার ব্যবস্থা করবেন কীভাবে? মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৮ এর গ্র্যান্ড ফিনালের দিন সকালের দিকেই মিলনায়তনে থাকার কথা ছিল। সেখানে পৌঁছাতেও দেরি হয়। আম্মুর অবস্থা সেদিন খুবই খারাপ ছিল।

লাবণী আফরিন বলেন, আমি আসার কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল থেকে নার্স ফোন দিয়ে জানালো আমার মা মারা গেছে। এই খবর শুনে আমি কী করব না-করব কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আমার মাথায়ই আসলেই কাজ করছিল না। ঠিক স্বপ্নপূরণের কাছে দাঁড়িয়ে আমি বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার মা মারা গেছে, আর আমি এখানে… বিষয়টি কাউকে না জানিয়ে শেষ পর্যন্ত আমি অংশ নিয়েছিলাম। তবে কী করেছি ঠিক আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি।

আমার অবস্থা যখন খুবই খারাপ তখনই আবার ফোন আসে। আমি জানতে পারলাম আমার আম্মুর পাশের বেডের একজন মারা গেছে, আম্মু নয়। হাসপাতালে আমি নেই আম্মু একা তাই আরো ভয় পাচ্ছিলেন খুব। আর এ কারণে সেদিন আম্মুর অবস্থা আরো বেশি খারাপ হয়ে গিয়েছিল। নার্স আমাকে মেসেজ দিয়ে জানাল যে, তাকে এখনই আইসিইউতে নিতে হবে।

এ বিষয়ে লাবণী বলেন, উইশের মানে আমি জানি কি-না সেটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়ছি। সেই সময় আমার মাথার ভেতরে কি ঢুকছে আর বেরোচ্ছে সেটা তো আমিও বুঝতে পারছিলাম না। আমার কাছে সেটা ছিল একটা ঘোরের সময়। আমি একসাথে অনেকগুলো চিন্তা করছি। অনেকগুলো চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। তারমধ্যে ওই প্রশ্ন এবং আমার ভুল উত্তর।

লাবণীর ভাষায়, ‘আম্মুকে দ্রুত আইসিইউতে নিতে হবে। এটাই মুখ্য হয়ে যাচ্ছিল। শুধু মনে হচ্ছিল মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যাই।’

লাবণীর কাহিনি যেন সিনেমার মতো। আনায়াসে একটা চিত্রনাট্য তৈরি করে ফেলা যায়। যেমন প্রতিযোগিতার রেজাল্ট না কোনোমতে জেনেই বাইরে চলে আসেন। ‘সিএনজি পাচ্ছি না, পাচ্ছি না কোনো বাইক। ভয়ঙ্কর অবস্থা। রাতে যখন বারডেমে পৌঁছলাম, তখন আম্মু আইসিই্উতে। আমাকে ঢুকতে দিল না। সারারাত সাজসজ্জা অবস্থায় বারান্দাতেই কাটালাম। সবাই ঘুরে ঘুরে দেখছিল। পরেরদিন আসলাম আম্মুকে দেখলাম। আম্মু রয়েছেন কিন্তু তার বোধ নেই। পরেরদিন পরীক্ষা, আমি বাসায় গিয়ে পড়লাম। আম্মুর খোঁজ-খবর নিলাম। তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে খোঁজ নিয়ে জানলাম কন্ডিশন ভালো না। পরীক্ষা দিতে চলে গেলাম। পরীক্ষা শেষে জানলাম আম্মু আর নেই। ২ অক্টোবর এরপর আম্মুর লাশ রাজবাড়ীর পাংশায় নিয়ে এসে দাফন করেছি।

লাবণী আফরিন বলেন, কে ট্রল করল, কে কি করল তাতে আমার যায় আসে না। ‘উইশ’ এর বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। সেইসময় আমার মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল না, তারপর মঞ্চ থেকে মঞ্চেই সাউন্ডের সমস্যা। তাৎক্ষণিকভাবে যে অর্থটা মাথায় ঢুকেছে সেটাই উত্তর দিয়েছি। আমার বলার কিছুই নেই।

Comments are closed.