বিশেষ প্রতিবেদন ”আমাদের চারপাশ” – ফরহাদ আহমদ

0
রিপোর্ট : ফরহাদ আহমদ, বিয়ানীবাজার ভিউ-২৪ ডেস্ক, ২৭ আগস্ট ২০১৫,

কেমন লাগবে যদি আপনি কোন পরিকল্পনা করেন কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন না করতে পারেন? নিশ্চিতভাবে হীনমন্যতায় ভোগবেন। সিলেট শহরের কর্তা বেক্তিরা হয়তো একই হীনমন্যতায় ভোগছেন। প্রশ্ন করতে পারেন-কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কয়েক রকমের হতে পারে। আশা করি উত্তরটি নিচের কিছু কথায় খুজে পাবেন।

সিলেট শুধু বাংলাদেশের নয় পুরো উপমহাদেশের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। যেমন দীর্ঘ এর ইতিহাস তেমনি সমৃদ্ধ এর ঐতিহ্য । সময়র সাথে এর ইতিহাস যেমন আধুনিক রূপ পেয়েছে তেমনি হাজার বছরের পুরনো এ শহরও হয়েছে আধুনিক। আর একে আধুনিকতর করতেও চলেছে নানান প্রচেষ্টা। এই শহরটির বর্তমান রূপের পেছনে রয়েছে হাজারো মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম। যেমন আর সকল আধুনিক শহরে হয় তেমনি সিলেট শহরেও চলেছে একে আরো আধুনিক এবং আরো যুগোপযোগী করার প্রচেষ্টা। যার নমুনা হিসেবে সম্প্রতি নেয়া কিছু পরিকল্পনা দেখা গিয়েছে। এসব পরিকল্পনার কিছু বাস্তবায়িত হয়েছে আর কিছু সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। পরিকল্পনাগুলো জনগণও গ্রহন করেছিল স্বাদরে। কিন্তু বাংলাদেশে আর সকল উদ্যোগের যে নিয়তি হয় এই মহৎ উদ্যোগগুলোর কপালেও জুটেছে একই নিয়তি।

শহরের চেহারা, অর্থনৈতিক অবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা দিন দিন উন্নত হলেও সাধারন জনগণ দীর্ঘদিন যে সমস্যায় জর্জরিত ছিল তা হচ্ছে এই শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। এমন খুব কম বর্ষা কালই আছে যখন জনগণ ভুক্তভোগী হয়নি। সিলেট শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য এক সময় ব্যবহৃত হত প্রায় ৩২ কিলোমিটার বিস্তৃত নয়টি ছড়া। যার সংখ্যা সময়ের সাথে এবং দখলের প্রভাবে কমে এসেছে। এমন কিছু জয়গা আছে যেখানে ছড়ার বিস্তার ছিল ষাট ফুট কিন্তু এখন তা আধা ফুটেরও কম। কিছু কিছু জায়গায় তো পরিবর্তন হয়েছে ছড়ার গতি প্রকৃতি। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর জনাব আরিফুল হক চৌধুরী কথা দিয়ে ছিলেন পরিবর্তন করবেন এই দূরঅবস্থার। কিন্তু বেচারার নিজের অবস্থাই এখন এই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মত। হ্যাঁ, পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। শুরুতে কর্মতৎপরতাও দেখা গেছে ব্যাপক। সরকারি, বেসরকারি এনজিও এবং স্বয়ং সরকারের হস্তক্ষেপে কাজ শুরু হয় এই প্রকল্পের। যার ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩.২ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার। কাজ শুরু হয় যথারীতি। আর এই কাজের শুরু স্বয়ং অর্থমন্ত্রী এবং মেয়রের হাত ধরে। কিন্তু কিসের কি? ওই কাজ শুরু পর্যন্তই। টাকা খরচ হল, তোড়জোড়ও হল, কিন্তু পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এখন কালা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত প্রায়।

আরেকটি মহৎ উদ্যোগ যেটি জনগণ গ্রহন করেছিল হাসি মুখে, সেটি হচ্ছে সিলেট শহরের যানজট নিরশন কল্পে আলাদা রিক্সা লেন করা। যার বাস্তবায়নে খরচ করা হল প্রায় ষোল লাখ টাকা। ফলাফল পাওয়া গেল হাতেনাতে। যানজট মুক্ত হল সিলেট সেন্ট্রাল এরিয়া। কিন্তু আবার মুখ থুবড়ে পড়া। মেয়র আরিফুল হক সাহেবের অভাবে যেন পরিকল্পনাটি বাপ মা হারাল। প্রথমে পুলিশের উদার দিলের কারণে ধীরে ধীরে আগের মতই বসল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পসরা। তারপর তো আগের মত পুরোটাই চলে গেল তাদের দখলে। এতিম এ প্রকল্পটি বর্তমানে আনুষ্ঠানিক ভাবে শহর ছাড়া। এখন ওখানে রিক্সা চলে না। বাজার বসে।

আর নবনির্মিত ফুট ওভার ব্রিজটি তো মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের উর্বর মস্তিষ্কের সন্তান। নগরীর কোর্ট পয়েন্টে নির্মিত এই ওভার ব্রিজটির নির্মাণে ব্যয় করা হয় প্রায় সাড়ে এক কোটি টাকা। এটি নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য- জনগণের রাস্তা পারাপারে সুবিধা। কিন্তু দেখা গেল উল্টো এই জনগণই এটি ব্যবহারে অনাগ্রহী। এখনও মানুষ ওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে নিচের জনসমুদ্রে ধাক্কাধাক্কি করে রাস্তা পাড়ি দিচ্ছে। আর হতভাগা ওভারব্রিজ হয়ে উঠেছে যুবক ছেলেদের আড্ডাস্থল। হয়তো কোন ছেলে একা দাড়িয়ে সেলফি তুলছে আর ফেসবুকে পোস্ট করছে। যার শিরোনাম- অন দ্যা ওভার ব্রিজ-ফিলিং লোনলি। লোনলি ফিল করারই তো কথা। ব্রিজটি যে আর সবাই ব্যবহার করতে আগ্রহী নয়। এই অবস্থায় এত টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজটি নিজে যে লোনলি ফিল করছে না তা কে বলতে পারে?

সিলেট বিভাগ সারা বাংলাদেশে সৌন্দর্যের প্রতীক। আর এই বিভাগের কেন্দ্রীয় শহরটিকে আরো সুন্দর করতে নেয়া হল শহরের প্রবেশদ্বার কিন ব্রিজের আশ-পাশ এর সৌন্দর্য বর্ধনের পরিকল্পনা। সাধারণ মানুষও খুশি। মেহমানের সামনে নিজের ঘরকে আরো পরিপাটি করে তোলে ধরতে কে না চায়? বাড়ানো হল সৌন্দর্য। বিনিময়ে সরকারকে গুণতে হল প্রায় দুই কোটি টাকা। প্রতিটি পরিকল্পনারই সঠিক মনিটরিং বা নজরদারির দরকার হয়। এখানে দেখা দিল সেই মনিটরিং এর অভাব। যার ফল মদ,গাজা আর অন্যান্য নেশার আসর এখন এই সৌন্দর্যের প্রতিবেশী।

এখন শুরুর প্রশ্নটি যদি আবার করি। কি উত্তর দেবেন? জনগণের দেখবাল করা জনপ্রতিনিধি এবং সরকারের নিযুক্ত কর্তাব্যক্তিদেরই দায়িত্ব। আর এ দেখবালে যে জনগণের পকেটের টাকাও জড়িত সেটা খেয়াল রাখাও তাদের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। উপরের সবকয়টি পরিকল্পনা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু দয়া করে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটিয়ে নিজেদের এবং আমাদের হীনমন্যতার হাত থেকে রক্ষা করুন।

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.