Beanibazar View24
Beanibazar View24 is an Online News Portal. It brings you the latest news around the world 24 hours a day and It focuses most Beanibazar.

মেয়েদের নাম প্রকাশে নিষেধ যে দেশে


রাবিয়া; থাকেন পশ্চিম আফগানিস্তানে। অনেক জ্বর নিয়ে তিনি গেছেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার তার কোভিড-১৯ শনাক্ত করেছেন। রাবিয়ার অনেক জ্বর, সারা শরীরে ব্যথা।

রাবিয়া বাসায় ফিরে তার স্বামীর হাতে পেসক্রিপশনটা দিলেন, যাতে স্বামী তার জন্য ওষুধগুলো কিনে আনতে পারেন। স্বামীর চোখে পড়ল প্রেসক্রিপশনে রাবিয়ার নাম লেখা। ক্রোধে উন্মাদ হয়ে গেলেন স্বামী। বাইরের একজন অপরিচিত পুরুষের কাছে তার নাম প্রকাশ করার জন্য তাকে পেটাতে লাগলেন।

আফগানিস্তানের সমাজে এটাই দস্তুর। বাইরের অপরিচিত মানুষের কাছে মেয়েরা তাদের নাম গোপন রাখতে বাধ্য হন পরিবারের চাপে। এমনকি ডাক্তারের কাছেও নাম বলা যাবে না।

কিন্তু কিছু কিছু নারী এখন এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।

হোয়্যার ইজ মাই নেইম? আন্দোলন

সমস্যার শুরু হয় একজন কন্যা সন্তানের জন্মের সময় থেকেই। বহু বছর পর্যন্ত তার কোন নামই থাকে না। তাকে নাম দিতেই গড়িয়ে যায় বছরের পর বছর। একটি মেয়ের যখন বিয়ে হয়, বিয়ের আমন্ত্রণপত্রে কোথাও তার নাম উল্লেখ করা হয় না। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনেও প্রায়শই তার নাম উল্লেখ করা হয় না।

যখন মা’রা যায়, তখন তার মৃ’ত্যু সনদেও নাম লেখা হয় না। এমনকি কবরের স্মৃতিফলকেও নামহীনই থেকে যায়।

সে কারণেই আন্দোলনে নেমেছেন কিছু নারী। তারা চাইছেন তাদের নাম প্রকাশের স্বাধীনতা। তাদের আন্দোলনের নাম তারা দিয়েছেন হোয়্যার ইজ মাই নেম? আমার নাম কোথায়? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পোস্টারে এই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছেন আন্দোলনকারী নারীরা।

In a country where girls are not allowed to be named
মেয়েদের নাম প্রকাশে নিষেধ যে দেশে

আমার ভাই, আমার পিতা এবং আমার হবু স্বামীর সম্মান
আরেকজন নারী- তিনিও হেরাত প্রদেশের বাসিন্দা। বিবিসিকে বলেন, তিনিও তার নাম পরিচয় গোপন রাখতে চান। তিনি অবশ্য পুরুষদের এই আচরণের পক্ষে। তিনি বলেন, কেউ যখন আমাকে আমার নাম জিজ্ঞেস করে, তখন আমাকে ভাবতে হয় আমার ভাই, আমার বাবা বা আমার হবু স্বামীর সম্মান রক্ষার কথা। তখন আমি নাম বলতে চাই না।

আমি আমার পরিবারকে কষ্ট দেব কেন? আমার নাম বলে লাভটা কী হবে? ‘আমি চাই আমাকে আমার বাবার কন্যা বলে পরিচয় দেয়া হোক, আমার ভাইয়ের বোন বলা হোক। এবং ভবিষ্যতে আমি চাই আমার পরিচয় দেয়া হোক আমার স্বামীর স্ত্রী নামে, তারপর আমার ছেলের মা – এই নামে।

এই কাহিনিগুলো অবাক করার মত, কিন্তু এটাই আফগানিস্তানে নারীদের স্বাভাবিক চিত্র। মেয়েরা তাদের নিজেদের নাম ব্যবহার করলে সমাজ তাকে ভ্রূকুটি করে। এমনকি আফগানিস্তানের অনেক জায়গায় মেয়েদের নাম ব্যবহার করাকে পরিবারের জন্য অপমানজনক মনে করা হয়।

বহু আফগান পুরুষ তাদের বোন, স্ত্রী বা মায়ের নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন না। কারণ বাইরে তাদের নাম বলা লজ্জার এবং অসম্মানজনক। নারীদের সাধারণত পরিচয় দেয়া হয় পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের সূত্র ধরে- যেমন অমুকের মা, অমুকের বোন বা অমুকের মেয়ে।

আফগান আইন অনুযায়ী, শিশুর জন্ম সনদে শুধু বাবার নাম নথিভূক্ত করার বিধান আছে।

স্বামী অনুপস্থিত
এতে ব্যবহারিক কারণে নানা সমস্যা তো হয়ই, পাশাপাশি মানসিক দিক দিয়ে এর একটা প্রভাব থাকে। ফরিদা সাদাতের বিয়ে হয়েছিল শিশু বয়সে। তার প্রথম সন্তানের যখন জন্ম হয়, তখন তার বয়স ছিল ১৫। পরে স্বামীর সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ফরিদা তার চার সন্তানকে নিয়ে জার্মানি চলে যান।

তিনি বলছেন, তার সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনে, তাদের বেড়ে ওঠার সময় তার স্বামী শারীরিক এবং মানসিকভাবে অনুপস্থিত ছিলেন। তাই ফরিদা মনে করেন, আমার সন্তানদের পরিচয়পত্রে আমার স্বামীর নাম থাকার কোন অধিকার তার নেই।

‘আমি একাই আমার সন্তানদের বড় করেছি। স্বামী আমাকে ডিভোর্স দিতে চাননি, যাতে আমি আবার বিয়ে করতে না পারি। এখন আমি চাই না তার নাম আমার সন্তানদের পরিচয়পত্রে থাকুক। আফগানিস্তানে অনেক পুরুষ আছেন, আমার সাবেক স্বামীর মত, যাদের অনেক স্ত্রী আছেন। তারা সন্তানদের দেখেনও না। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্টর প্রতি আমার অনুরোধ তিনি যেন আইন বদলান, যাতে সন্তানদের জন্ম সনদে এবং তাদের পরিচয়পত্রে মায়ের নামও নথিভূক্ত করার বিধান থাকে।’

In a country where girls are not allowed to be named
মেয়েদের নাম প্রকাশে নিষেধ যে দেশে

আন্দোলন শুরু হয়েছে
এ রকম চলতে পারে না। তিন বছর আগে এমনটা মনে হয়েছিল ২৮ বছর বয়সী আফগান নারী লালেহ ওসমানীর। তিনি হেরাতের বাসিন্দা। তিনি এই প্রথায় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে শুরু করেছিলেন হোয়্যার ইজ মাই নেইম? আন্দোলন। যাতে নারীরা এই ‘মৌলিক অধিকার’ আবার ফিরে পেতে পারেন।

বিবিসির আফগান বিভাগকে লালেহ ওসমানী বলেন, তিনি এবং তার বান্ধবীরা আফগান নারীদের সামনে একটা প্রশ্নই রাখতে চেয়েছিলেন – আর তা হল, কেন আফগান নারীদের তাদের পরিচয় প্রকাশের স্বাধীনতা নেই।

‘আমাদের আন্দোলনের ফলে সন্তানের জন্ম সনদে বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নামও যাতে নথিভূক্ত করা যায়, তার জন্য আফগান সরকারকে রাজি করানোর পথে আমরা এক ধাপ এগিয়েছি।’

তিনি মনে করেন, বিবিসির আফগান বিভাগ বিষয়টি নিয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রচার করেছে তার ফলে আফগানিস্তান সংসদের প্রতিনিধি সভার সদস্য মারিয়াম সামা সংসদে এই আন্দোলনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

মারিয়াম সামা আবেদন করেছেন যাতে সন্তানের জন্ম সনদে মায়ের নাম নথিভূক্ত করার বিধান আনা হয়। তিনি এ নিয়ে টুইট করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনার পক্ষে সমর্থনও দেখা যাচ্ছে।

বিরোধিতা
বিবিসিকে দেয়া ওসমানীর সাক্ষাৎকার যখন ফেসবুকে পোস্ট করা হয়, তখন তাকে সমর্থন করে কিছু কিছু মন্তব্য আসলেও অনেক মন্তব্য ছিল খুবই সমালোচনামূলক। কেউ কেউ তার আন্দোলন নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেছেন। কেউ ঠাট্টা করে লিখেছেন, এরপর হয়ত ওসমানী আন্দোলন করবেন যাতে সন্তানের জন্ম সনদে সব আত্মীয়-স্বজনের নাম নথিভূক্ত করা হয়।

কেউ কেউ বলেছেন, পরিবারের মধ্যে শান্তি বজায় রাখাটা অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। একজন লিখেছেন, আপনি কোনটাকে অগ্রাধিকার দেবেন, সেটা আগে ভাবুন। বেশ কিছু পুরুষ এমন মন্তব্য করেছেন যে লালেহ ওসমানী নিজে জানেন না তার সন্তানের পিতা কে, তাই তিনি সন্তানের পরিচয়পত্রে নিজের নাম রাখতে চান।

ওসমানী বলেন, আফগানিস্তানের তরুণ প্রজন্ম, যারা অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত ও সচেতন, তারা যে এমন ‘কুৎসিত মন্তব্য’ করতে পারে, সেটা দেখে তিনি হতাশ।

তারকা সমর্থন
আফগানিস্তানের তারকা ও বিশিষ্ট কিছু মানুষ এই আন্দোলনকে সমর্থন করছেন। সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক ফারহাদ দারিয়া এবং সঙ্গীত রচয়িতা আরিয়ানা সাঈদ প্রথম থেকেই এই আন্দোলনের পক্ষে আছেন।

ফারহাদ দারিয়া থাকেন আমেরিকায়। তিনি বলছেন, কারও মা, বোন, কন্যা বা স্ত্রী সেটা পরিবারে একজন নারীর স্থানকে বোঝায়। সেটা ওই নারীর পরিচিতি নয়। পুরুষ যখন একজন নারীর নিজস্ব পরিচিতিকে অস্বীকার করে, তখন সেই নারীরাও বিশ্বাস করতে শুরু করে তাদের আলাদা কোন পরিচয় থাকতে পারে না।

আরিয়ানা সাঈদ আফগানিস্তানের অন্যতম জনপ্রিয় একজন গায়িকা এবং নারী আন্দোলনের একজন প্রবক্তা। তিনি বিবিসিকে বলেন, তিনি এই আন্দোলনের পেছনে আছেন। তবে তার ভয় এই আন্দোলনকে তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।

সে নারীকে সূর্য এবং চন্দ্রও দেখেনি
আফগানিস্তানের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের পরিচিতিকে স্বীকৃতি না দেয়ার প্রধান কারণ হল, পুরুষরা তাদের ‘সম্মান রক্ষায়’ নারীদের সারা শরীর ঢেকে রাখতেই শুধু বাধ্য করেন না, তারা চান মেয়েদের নামও ঢেকে রাখতে- বলছেন আফগান সমাজবিজ্ঞানী আলী কাভে।

তিনি আরো বলেন, আফগান সমাজে, তারাই আদর্শ নারী যাদের কখনও চোখে দেখা যায়নি, যাদের কণ্ঠ কখনও শোনা যায়নি। প্রবাদ আছে, সে নারীকে সূর্য এবং চন্দ্রও দেখেনি।

‘যেসব পুরুষ সবচেয়ে কঠিন এবং কঠোর, সমাজে তারাই সবচেয়ে সম্মানিত। তাদের পরিবারের নারী সদস্যরা যদি স্বাধীন হয়, তাহলে সে নারীকে ব্যভিচারিণী এবং অসম্মানিত বলেই বিবেচনা করা হয়।’

আফগান চিকিৎসক শাকারদক্ত জাফারী, যিনি থাকেন ইংল্যান্ডের সারে এলাকায়, তিনি মনে করেন আফগান নারীকে তার নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরতে হলে তার আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক স্বাধীনতারও প্রয়োজন। আফগানিস্তানে যেসব পুরুষ নারীদের তার পরিচয় প্রকাশ করতে দেয় না, সরকারকে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

প্রায় দুই দশক আগে তালেবান শাসনের পতন ঘটার পর থেকে আফগানিস্তানে নারীদের প্রকাশ্যে আনার চেষ্টা হচ্ছে দেশের ভেতর থেকে এবং বাইরে থেকেও। কিন্তু তারপরেও রাবিয়ার মত নারীরা স্বামীদের হাতে নিগৃহীত হচ্ছেন চিকিৎসকের কাছে নিজের নাম বলার কারণে।

ডা. জাফারী মনে করেন, আফগানিস্তানের মত খুবই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেখানে নাগরিক সংগ্রাম দিয়ে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সফল হওয়া কঠিন, সেখানে এই বৈষম্য দূর করতে হলে সরকারেই এগিয়ে আসতে হবে। বিবিসি বাংলা।

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.