সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) মাজারের সংগৃহীত দানের হিসাব ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী সংগৃহীত হলেও কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। এই অস্পষ্টতা দূর করতে স্থানীয় প্রশাসন এখন থেকে মাজারের আয়-ব্যয় তদারকি ও নিয়মিত নিরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে।
মাজার কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে তাদের ঐতিহ্যগত অধিকার ও আইনি প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে নির্ধারিত অর্থ প্রদানে ব্যর্থতা মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন এখন মাজারের দানবাক্স নিয়ন্ত্রণ ও যাবতীয় হিসাব যাচাইয়ের ওপর জোর দিচ্ছে।
সিলেটের ঐতিহাসিকভাবে খ্যাত হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারে প্রতিদিন ভক্তদের দেওয়া লাখ লাখ টাকার নগদ অর্থ এবং সোনাদানা ও গবাদিপশুর মতো মূল্যবান দানের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ৭০০ বছর ধরে চলে আসা এই দান সংস্কৃতির কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকায় ভক্তদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের কাজ চলাকালে মাজার দুটির আর্থিক ব্যবস্থাপনার এই অস্পষ্ট চিত্রটি সামনে আসে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাজারের প্রতিদিনের আয়-ব্যয়ের প্রকৃত কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। ইমাম সমিতি সিলেট মহানগরের সভাপতি মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব এই বিষয়ে জানান, মাজার কর্তৃপক্ষ মাত্র এক দিনের একটি খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছে। সেই প্রতিবেদনে এক দিনেই নগদ ১ লাখ ৪৩ হাজারেরও বেশি টাকা আদায়ের তথ্য থাকলেও, ভক্তদের দান করা সোনাদানা কিংবা গরু-ছাগলের মতো মূল্যবান সামগ্রীর কোনো হিসাব উল্লেখ করা হয়নি।
আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবার কঠোর অবস্থান নিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। সিলেট জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম জানিয়েছেন, এখন থেকে প্রশাসনের একটি সমন্বয় কমিটি আগামী এক মাস মাজারের যাবতীয় হিসাব সংরক্ষণ করবে। সরকারি কর্মকর্তা ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এই হিসাব পরিচালনা করবে এবং প্রশাসন প্রতি মাসে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পর এক মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার জন্য ওয়াক্ফ এস্টেটকে মাজারের দানবাক্সে তালা দিতে বলা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান।
অন্যদিকে, প্রশাসনের এমন আকস্মিক উদ্যোগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মাজার কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, এ সংক্রান্ত বৈঠকে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাদেরকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। মাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “আমাদেরকেও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। আমরা কীভাবে এটি পরিচালনা করছি তা দেখাতে চাই। আমরা ভক্তদের কাছ থেকে ‘নজরানা’ নিই এবং তা ভোগ করি—এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই চলে আসছে।” এ বিষয়ে তাদের পক্ষে একটি আদালতের রায় রয়েছে এবং ওয়াকফ কমিশনের সাথেও একটি মামলা চলমান আছে বলে তারা জানান।
মাজারের এই বিপুল আয়ের দাবি করা হলেও, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নে ব্যর্থ হয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই মাজারে চলমান একটি উন্নয়ন প্রকল্পে মাজার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ৫ কোটি টাকা দেওয়ার চুক্তি ছিল। তবে প্রকল্পের ৬৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেলেও, মাজার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ প্রদান করতে পারেনি।


