সিলেটের মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজের ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমানের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত।
ধর্ষণকান্ডের আগে থেকেই আলোচিত ছিলেন এই সাইফুর। বিশেষত টিলাগড় ও এমসি কলেজ এলাকায় সাইফুরের বিরুদ্ধে সন্ত্রসী কর্মকান্ড ও ত্রাস সৃষ্টি অভিযোগ ছিলো।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ঘটা ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরুর পর গ্রেপ্তার এড়াতে ভােতে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সাইফুর।
পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে দাঁড়ি কেটে, মুখে মাস্ক পরে ছাতক হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন সাইফুর রহমান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুনামগঞ্জের ছাতকে সুরমা নদীর খেয়াঘাট থেকেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি। তিনি এই ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আরও তিনজনকে যাবজ্জীবন ও ৪ জনকে খালাস প্রদান করা হয়।
রায় ঘোষণার পরে ফের আলোচনায় আসতে শুরু করেন তৎকালীন সিলেট মহানগরীর টিলাগড় গ্রুপের অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ ক্যাডার সাইফুর রহমান।
জানা যায়, ছাত্রলীগ ক্যাডার সাইফুর রহমানের গ্রামের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায়। তিনি সিলেট এমসি কলেজের ইংরেজি বিভাগের স্নাতক শ্রেণির অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন। এবং তিনি এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ১০২ নাম্বার রুম দখল করে সেখানে বসবাস করতেন। সাইফুর রহমান ছাত্রলীগের টিলাগড়কেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সিলেট টিলাগড় ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডার ছিলেন বলে জানা গেছে।
এছাড়াও এমসি কলেজ ছাত্রাবাস এলাকায় তার ব্যাপক প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কলেজে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আধিপত্য বিস্তার, গ্রুপিং রাজনীতি, ছাত্রীদের উত্যক্ত করা, র্যাগিং করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে সাইফুরের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রাবাসে সাইফুরের দখলে থাকা ২০৫ নং কক্ষে আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের মজুদ করে রাখা হতো। এছাড়া টিলাগড় ও আশপাশ এলাকায় সক্রিয় একটি ছিনতাই, চাঁদাবাজিতেও তার নিয়ন্ত্রণ ছিল।
জানা যায়, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পরে দুইটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। ধর্ষণে অভিযুক্ত তরুণীর স্বামী একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন এবং অপরটি ২০২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর শাহপরান থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিল্টন সরকার বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলা দায়েরের পর ওই দিন ভোররাতে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সাইফুর রহমানের কক্ষে অভিযান চালিয়ে একটি পাইপগানসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।
সে সময় শাহপরান থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, অভিযানে একটি পাইপগান, চারটি রামদা, একটি ছুরি এবং দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করা হয়। এসব আলামত তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগকে আরও জোরালো করে।
ভারত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা:
এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনার পর আত্মগোপনে চলে যান সাইফুর। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কেউ যেনো তাকে চিনতে না পারে তাই নিজের দাঁড়ি কেটে ফেলেছিলেন সাইফুর।
ভারত পালিয়ে যাওয়ার সময় ছাতক খেয়াঘাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সেদিন প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে এক ব্যক্তিকে ঘাটে সন্দেহজনকভাবে অপেক্ষা করতে দেখে পুলিশ তার কাছে যায়। প্রচারিত ছবির সঙ্গে চেহারার মিল থাকায় পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। এরপরই তাকে আটক করা হয়।
খেয়াঘাট এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘাট পার হওয়ার পর দোয়ারাবাজার হয়ে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছানোর একাধিক পথ ছিল।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছরের বিচারিক কার্যক্রম শেষে মঙ্গলবার ঘোষিত রায়ে সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
অন্যদিকে, পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় আইনুদ্দিন (আইনুল), মিসবাউল ইসলাম (রাজন), রবিউল এবং মাহফুজুর রহমানকে অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন আদালত।


