শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, সিলেট থেকে জাফলং পর্যন্ত প্রস্তাবিত রেলপথের ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা) আগামী এক মাসের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে। এইসময়ে এই রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজও দৃশ্যমানভাবে শুরু হবে।
তিনি বলেন, খসড়া সমীক্ষা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, এখন চূড়ান্ত সমীক্ষার কাজ চলছে।
শনিবার (১ আগস্ট) গোয়াইনঘাট উপজেলায় সিলেট-জাফলং রেলপথ প্রকল্প নিয়ে আয়োজিত এক সমন্বয় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক উপস্থিত ছিলেন।
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আজকের সফরের উদ্দেশ্য হলো সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে এসে সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। কারণ একসঙ্গে না বসলে একজনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আরেকজনের সমন্বয় হয় না। ট্রেন ও বাসে একসঙ্গে আসার কারণে আমরা অনেক বিষয়ে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি।
সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক ও প্রস্তাবিত রেলপথের মধ্যে সমন্বয়ের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সিলেট থেকে জাফলং পর্যন্ত যে রেলপথ আনা হবে, তা মহাসড়কের কাছাকাছি দিয়ে নিয়ে এলে নির্মাণ খরচ অনেকটাই কমে আসবে। যেমন সারি নদীর ওপর যে সেতু হবে, সেখানে আমরা এখন ভাবছি দুটি আলাদা সেতুর প্রয়োজন নেই। একটি সেতুর নিচ দিয়ে রেলপথ এবং ওপর দিয়ে সড়ক নিয়ে আসা যেতে পারে।
তিনি জানান, উপদেষ্টা কমিটি, জেলা প্রশাসক, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক অবকাঠামো বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সবাই একমত হয়েছেন যে, রেলপথ নির্মাণে স্থানীয় বাজারগুলো বাইপাস করা হবে, যাতে বাজার ভাঙতে না হয় এবং মানুষের স্কুল-মসজিদও অক্ষত থাকে।
মন্ত্রী বলেন, আসার পথে একাধিক রেলস্টেশনে যাত্রাবিরতি দিয়ে যাত্রীসেবা সংক্রান্ত বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার প্রতিফলন আগামী এক মাসের মধ্যে দেখা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া জমি অধিগ্রহণ সম্ভব নয়। রেলওয়ে ও সড়ক বিভাগের মধ্যে সমন্বয় না হলে দুটি প্রকল্প ভিন্ন দিকে চলে যাবে। তাই সমন্বিতভাবে কাজ করার এই উদ্যোগ।
রেলপথের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান, প্রকৌশল বিভাগের কারিগরি প্রতিনিধিরা ঢাকায় ফিরে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
তিনি বলেন, সিলেট-জাফলং রেললাইন চালু হলে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পে নতুন গতি সৃষ্টি হবে। পর্যটননির্ভর অর্থনীতি সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, জাফলংয়ের পাথর কোয়ারি উচ্চ আদালতের আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং অনেকটাই জটিলতা নিরসনের পর্যায়ে এসেছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর কোয়ারি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রথমত, নির্বাচনের আগেই যে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর কোয়ারি তুলে দেওয়ার কথা ছিল, তার আইনি প্রক্রিয়াগুলো শেষ করে খুব শিগগির সনাতন পদ্ধতিতে কোয়ারি খুলে দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, রেলপথের পাশাপাশি সড়ক নির্মিত হলে এখানে পর্যটনকেন্দ্রিক রেস্তোরাঁ, শিশুদের জন্য কিডস জোন, ওয়াশরুমসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠবে, যাতে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। রেলপথ চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, শ্রম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্থানীয় শ্রমিকদের স্বল্প খরচে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা দালালের প্রতারণার শিকার না হন। এ লক্ষ্যে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের জন্য ইতিমধ্যে জমি বরাদ্দ চেয়ে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাঁর নিজ এলাকার তিনটি উপজেলায় প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স নির্মাণ করে সেখানে ইলেকট্রিশিয়ান, ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছরে দেশে ও প্রবাসে মোট এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রার কথা বলেছেন এবং সে অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রবাসী কর্মসংস্থানের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের এক কোটি মানুষকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে বিদেশে কর্মসংস্থানের আওতায় আনা হবে। এ লক্ষ্যে গোয়াইনঘাটে দুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে স্থানীয় যুবকদের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে দালালমুক্ত ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
এ সময় প্রতিনিধিদল সিলেট থেকে জাফলং পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্য রুট ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।


