আলোচিত খবরপ্রবাস

দুই মাসের মধ্যে ফেরত না নিলে ছেড়ে দেয়ার হুমকি আঙ্কারার

তুরস্কে আটক ২৭০ বাংলাদেশী







অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে বিভিন্ন সময় তুরস্কে আটক হন বাংলাদেশীরা। এভাবে আটক হওয়া ২৭০ বাংলাদেশীর একটি তালিকা পাঠিয়েছে আঙ্কারা। আগামী দুই মাসের মধ্যে এদের ফেরত আনতে বলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যদি ফেরত আনা না হয়, তাহলে আটককৃত এসব বাংলাদেশীকে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে দেশটি।



পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েক বছর ধরে ইউরোপে পাড়ি জমানোর লক্ষ্যে তুরস্কে গিয়ে প্রায়ই আটক হন বাংলাদেশীরা। তাদের বেশির ভাগেরই পাসপোর্ট বা বৈধ কাগজপত্র নেই। দেশী-বিদেশী দালালচক্রের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ইরান, লেবানন, জর্ডান হয়ে তুরস্ক গেছেন তারা। আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তাদের সরবরাহ করা তথ্যমতে, আটকা পড়া বাংলাদেশীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়া হয়ে গেছেন। যদিও কয়েক বছর ধরে লিবিয়া ভ্রমণে বাংলাদেশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এখনো যা বহাল।



ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে তুরস্কে আটক হওয়া এ ধরনের ২৭০ বাংলাদেশীর তালিকাসহ একটি চিঠি পাঠিয়েছে তুরস্ক। আগামী দুই মাসের মধ্যে এদের বাংলাদেশে ফেরত আনতে বলা হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে ফেরত আনলে পুরো প্রত্যাবাসন খরচ তুরস্ক বহন করবে। যদি দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন না করা হয়, তবে তাদের মুক্ত করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে আঙ্কারা।



বিষয়টি নিশ্চিত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বেশ আগেই তাদের দেয়া দুই মাস পার হয়ে গেছে। হয়তো এরই মধ্যে আটককৃতদের মুক্তও করে দিয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, এ ২৭০ জনের মধ্যে ২৫০ জনের জন্মই ১ জানুয়ারি। তুরস্ক থেকে যে তালিকাটি দিয়েছে, তা দেখলেই বোঝা যায় এ তথ্যে গরমিল রয়েছে। এদের যদি আমরা ফেরত না আনি, আর তুরস্ক যদি তাদের ছেড়ে দেয়, তবে এরা আবার ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়বেন। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া দুই মাসের মধ্যে ফেরত আনাও সম্ভব নয়। এ সময়ের মধ্যে এদের পূর্ণাঙ্গ যাচাই-বাছাই সম্ভব নয়। যেহেতু তুরস্কে আটকা পড়েছেন, তাদের যাচাই ছাড়া ফেরত আনা নিরাপত্তার জন্যও এক ধরনের হুমকি।



তিনি বলেন, ইউরোপ যাওয়ার জন্য যেসব বাংলাদেশী তুরস্ক গেছে, তাদের একটি বড় অংশ দেশটির ডিটেনশন সেন্টারে রয়েছে। অনেকে ছাড়াও পাচ্ছেন। দেশটির ডিটেনশন সেন্টারে বেশি দিন রাখা হয় না। ফলে ঢাকা যাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে দূতাবাসে রিপোর্ট পাঠায়, তাদেরও অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ আঙ্কারার কাছে তারা মিথ্যা তথ্য দেন। ফলে তাদের পরিচয় বাংলাদেশে শনাক্তকরণ কঠিন হয়ে পড়ে। এটি সময়সাপেক্ষও।

কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশীদের মধ্যে ইউরোপ যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে বৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশীরা ইউরোপের মোহে পড়ছেন। তারাও দালাল চক্রের প্ররোচনায় বৈধ কর্মসংস্থান ছেড়ে অবৈধ এবং অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা করছেন। বিভিন্ন সময় তুরস্কে বাংলাদেশ মিশন ঢাকাকে যে রিপোর্ট দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে তুরস্ক হয়ে অবৈধ পথে ইউরোপ প্রবেশের চেষ্টা সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ।



বর্তমান সময়ে এটি প্রায় বন্ধ। ইউরোপে ঢোকার চেষ্টায় কেবল বাংলাদেশীই নন, অনেক দেশের লোকজন তুরস্কে যান। বাংলাদেশীদের ইউরোপে প্রবেশের প্রবণতা ঠেকাতে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে অবৈধ ইউরোপ যাত্রায় লিবিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ঢাকা থেকে কেউ যাতে বের হতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। তা না হলে তুরস্কে বাংলাদেশীদের নিয়ে মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে, যা ঢাকা-আঙ্কারা বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।

জানা গেছে, ডিটেনশন সেন্টার থেকে বের হয়েও অনেকে সমুদ্রপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেন। এতে অনেকেরই সাগরে মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি সপ্তাহে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের সময় তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে প্রায় ৩৭ বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া তুরস্কে সক্রিয় ও সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে ভিনদেশী যেসব লোক জীবনের এমন ঝুঁকি নেন, তারা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েন। সে তালিকায় বাংলাদেশীও রয়েছেন। তারা যা অর্থ খরচ করে ইউরোপ যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন, তা যেমন উদ্ধার করতে পারেন না, তেমনি অভিবাসন নিয়ে কঠোর হওয়ায় ইউরোপও পাড়ি দিতে পারেন না। উভয় সংকটে থাকা ভিনদেশীরা এজন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে পেটি ক্রাইমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। কর্মকর্তারা জানান, তুরস্কের সঙ্গে ইইউর বিদ্যমান অভিবাসন চুক্তির কারণে অবৈধ পথে তুরস্ক থেকে ইউরোপে পাড়ি জমানো এখন প্রায় অসম্ভব।

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশে এক লাখের ওপর অবৈধ বাংলাদেশী রয়েছে। তাদের ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ইইউর সঙ্গে নীতিগতভাবে সম্মত রয়েছে এবং সে অনুযায়ী বাংলাদেশীরা প্রত্যাবাসিত হচ্ছেন।














Related Articles

Close