ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু: সিলেট বিভাগের এক জেলা থেকেই ১২ প্রাণহানি

ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু: সিলেট বিভাগের এক জেলা থেকেই ১২ প্রাণহানি

লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার সময়ে পথ হারিয়ে নৌকায় মারা যাওয়া ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মধ্যে ১২ জন বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।

এরআগে এই জেলার ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য জানা গেলেও পরে আরও দুজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। সবমিলিয়ে হাওরবেষ্টিত এই জেলা থেকে মারা গেছেন। এ তথ্য জানিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশ।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, তারা এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। এর মধ্যে দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন আছেন।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, যেসব দালালের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করবে জেলা প্রশাসন।

মৃত ব্যক্তিদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। আর যাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁদের রাখা হয়েছে গ্রিসের একটি ক্যাম্পে। মারা যাওয়া ২২ জনের মধ্যে ১২ জন বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের। তাঁদের পরিচয় মিলেছে।

৬ মার্চ ভূমধ্যসাগর নৌকায় পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছান হবিগঞ্জের এক যুবক। তাঁকে গ্রিসের একটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। ২৭ মার্চ উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদেরও একই ক্যাম্পে রেখেছে দেশটির কোস্টগার্ড।

তিনি বলেন, মূলত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণেই ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা যান। নৌকাটি পথ হারিয়ে সাগরে ছিল ছয় দিন। এতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়।

ওই যুবক বলেন, শনিবার তিনি ক্যাম্পে আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা সুস্থ আছেন। ওই যুবক বলেন, বোটটি পথ হারিয়ে ফেলে। ছয় দিন সাগরে ছিল। এ সময় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে অনেকে মারা গেছেন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সুনামগঞ্জের। তবে মৃত মানুষের সঠিক সংখ্যা তাঁদের জানাতে পারেননি আহত ব্যক্তিরা। মৃত ব্যক্তিদের দুই দিন বোটে রেখে পরে তাঁদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। সীমিত খাবার নিয়ে ছোট ছোট বোটে করে লোকজনকে লিবিয়া থেকে গ্রিসে পাঠানো হয়।

পুলিশ, পরিবার, প্রতিবেশী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ১২ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা হলেন দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫) ও একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েক মিয়া ও বাসুরি গ্রামের সোহাস; দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম; জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী।

সুনামগঞ্জের মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারে এখন চলছে মাতম। এ ঘটনায় দালালদের বিচার চাইছেন অনেকে।

রোববার দুপুরে জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিয়ারগাঁও গ্রামের মৃত শায়েক আহমদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর বাবা আখলুছ মিয়া উঠানে পড়ে আহাজারি করছেন। তিনি দীর্ঘদিন কুয়েতে ছিলেন। আখলুছ বলেন, ‘আমার পুয়ার লাখন সুন্দর ছেলে এলাকাত আর নাই। আমার পুয়ারে আইন্যা দেয়। আমার পুয়ারে না খাওয়াইয়া মারল। আমি দালাল আজিজুলের ফাঁসি চাই।’

তিনি আরও বলেন, ছেলেক গ্রিসে পাঠাতে এলাকার ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজুল ইসলামকে দুই দফা ১২ লাখ টাকা দিয়েছেন। আজিজুল লিবিয়ায় থাকেন। তিনিই এলাকার যুবকদের লিবিয়া থেকে গ্রিসে পাঠান।

উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম তাঁর এলাকার দুজনের মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়েছেন। রানীগঞ্জ ইউনিয়নের পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম তাঁর ওয়ার্ডে দুজনের মৃত্যুও তথ্য জানিয়েছেন। পাইলগাঁও গ্রামের মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তাঁর ভাই মারা গেছেন। দোয়ারাবাজার উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জামাল উদ্দিন তাঁর ভাগনের আবু ফাহিমের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য এওর মিয়া মুঠোফোনে বলেন, মারা যাওয়া চারজন তাঁর আত্মীয়। শনিবার বিকেলে ওই নৌকায় থাকা গ্রামের আবদুল কাহারের ছেলে রোহান আহমদ (২৫) ফোনে বিষয়টি জানিয়েছেন। রোহান আহমদ জানিয়েছে, গেমে (নৌকায়) খাবার ও পানির সংকটের কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে অনেকেই মারা যান। পরে তাঁদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

একই গ্রামের বাসিন্দা বর্তমান ইউপি সদস্য শাহনূর মিয়া বলেন, রোহানই ফোনে গ্রামের চারজনের মৃত্যুর খবরটি জানিয়েছেন। রাবারের নৌকায় করে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে নেওয়া হয়। এটিকে লোকজন গেম বলে। গেমেই তাঁরা মারা গেছেন।

মারা যাওয়া সাহান এহিয়ার বড় ভাই মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, প্রত্যেকেই ১২ লাখ টাকায় গ্রিসে যাওয়ার জন্য দালালের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। গত মাসে তাঁরা বাড়ি থেকে রওনা দেন। লিবিয়া যাওয়ার পর অর্ধেক টাকা পরিশোধ করা হয়। কয়েক দিন ধরে তাঁদের কোনো খোঁজ ছিল না। শনিবার বিকেলে চাচাতো ভাই রোহান ফোনে তাঁদের মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়েছেন।