ছিলেন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, পরে আওয়ামী লীগের আমলেই টানা দুবার নির্বাচিত হন সিটি মেয়র। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। আর মঙ্গলবার পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আরিফুল হক চৌধুরী।
শপথ গ্রহণের পর শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন এই বিএনপি নেতা। আরিফুল হক, যিনি আরিফ নামেই সিলেটের সবার কাছে পরিচিত, তার রাজনৈতিক জীবন নানা উত্থান-পতনে ভরপুর; যেন রূপকথার গল্পের মতো।
সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের স্নেহধন্য ছিলেন আরিফ। সাইফুর তাকে বলতেন ‘ডিপ্লোমেটিক লিডার’। সাইফুরের আস্থাভাজন হয়ে গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেটের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদে পরিণত হন আরিফ।
এরপর দেশের শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তালিকায় নাম আসা, জেল খাটা, সেখান থেকে ফিরে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়া, এরপর আরেক সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় জেলে যাওয়া, তারপর আবার মেয়র হওয়া, নিজে দলে কোণঠাসা হয়ে পড়া, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ও সবশেষ মন্ত্রী হিসেবে শপথ—আরিফের রাজনৈতিক জীবন এমন নানা উত্থান-পতনে ভরপুর।
ছাত্রদলের রাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতি শুরু আরিফের। ছিলেন মহানগর বিএনপির সভাপতিও। এখন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদে আছেন। আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার (বর্তমান পদের নাম কাউন্সিলর) হিসেবে প্রথম জনপ্রতিনিধি হন। এরপর টানা দুইবার ছিলেন মেয়র। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমপি (সংসদ সদস্য) হয়েছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হওয়ার আগে আরিফুল হক দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। এর আগে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন। জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, শহর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং এমসি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
তবে তাঁর উত্থান মূলত বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেট-১ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য এবং তখনকার বিএনপি-দলীয় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের বদৌলতে। ২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হন আরিফ। তবে সাইফুর রহমানের সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে নগরের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আরিফই ছিলেন প্রধান ব্যক্তি। কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সিটি করপোরেশনের নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির দায়িত্ব পান। তবে তখন তাকে বলা হতো ‘ছায়া মেয়র’। কেউ কেউ ‘ছায়া অর্থমন্ত্রী’ও বলতেন।
তবে ২০০৭ সালে ‘ওয়ান ইলেভেন সরকার’ হিসেবে পরিচিত সেনা-নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে ছন্দপতন ঘটে আরিফের এই উত্থানে। তখন দেশের শীর্ষ ৫০ দুর্নীতিবাজের তালিকায় উঠে আসে আরিফুল হকের নাম। পরে কারাগারেও যেতে হয় তাকে। এরপর সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে আরও বেকায়দায় পড়েন আরিফ। দলেও কোণঠাসা হয়ে পড়েন তিনি। তখন অনেকেই আরিফুল হকের রাজনীতির শেষ দেখে ফেলেছিলেন।
তবে ২০১৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের প্রবল আপত্তির মুখেও মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পান আরিফ। ওই নির্বাচনে সিলেটের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা, আওয়ামী লীগ দলীয় প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে প্রথমবার মেয়র হন। ২০১৮ সালে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। একমাত্র সিলেটে বিএনপি থেকে আরিফুল হক মেয়র নির্বাচিত হন।
বিএনপির মনোনয়নে আরিফুল টানা দুই মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হয়ে উন্নয়নকাজের জন্য প্রশংসিত হন। সব মহলের কাছে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। তবে সবশেষ ২০২৩ সালের ২১ জুন অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে দলের আপত্তির কারণে অংশ নেননি তিনি। দলীয় নির্দেশনা মেনে প্রার্থী না হওয়ায় বিএনপিতে পুরস্কৃত হন আরিফ। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য থেকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদ পান।
সিলেট বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, এবার সিলেট-১ (নগর ও সদর) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন আরিফুল হক। তবে এ আসনে মনোনয়ন পান বিএনপির চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা (নতুন বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী) খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। আর দলীয় প্রার্থিতা ঘোষণার প্রথম দফায় আরিফের নাম ছিল না।
পরে নানা নাটকীয়তা শেষে আরিফকে নগরের বাইরে সিলেটের সীমান্তঘেঁষা সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী করা হয়। তবে নগর ছেড়ে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হতে রাজি ছিলেন না তিনি। গত ৫ নভেম্বর রাতে দলের হাইকমান্ড তাকে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হতে নির্দেশনা দেয়। পরে ৭ নভেম্বর থেকে তিনি নির্বাচনী এলাকায় প্রচার শুরু করেন। ৪ ডিসেম্বর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করা হয়। আর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী।



