প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের মানুষের ঈদের কেনাকাটা অনেকাংশে রেমিট্যান্সে নির্ভর। তাই ঈদ বাজার জমে ওঠে দেরিতে। কিন্তু এবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব যেন আঁচ করা গেছে ঈদ বাজারে। কেবল নগরেই নয়, পুরো সিলেটজুড়ে উদ্বেগ ছিল চোখে পড়ার মতো।
শেষ বেলায় বাজার জমে উঠলেও ঝড়-বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়ায় কেনাকাটায়। গত ২/৩ দিনের বৃষ্টিতে কেনাকাটায় বিঘ্ন ঘটেছে। বাজারে ক্রেতা থাকলেও বিক্রি ছিল না সেভাবে।
অবশ্য শেষ সময়ে এসে কেনাকাটায় যেন জোয়ার নেমেছে।
সড়কের পাশ থেকে শপিং মল, সবখানে জনস্রোত। দিন পেরিয়ে রাত, কেবল ইফতারের সময়টুকু বাদ দিয়ে কেনাকাটা থেমে নেই এক মুহূর্তের জন্য। ভোররাত পর্যন্ত চলছে কেনাকাটা।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, দুপুর থেকে ক্রেতারা মার্কেট, শপিং মলে আসতে শুরু করেন।
ইফতারের মিনিট পাঁচেক আগ পর্যন্ত চলে কেনাকাটা। ইফতার শেষে আবার শুরু হয় ক্রেতা সমাগম। রাত যতই গভীর হয়, ক্রেতাদের চাপ ততই বাড়তে থাকে।
বুধবার (১৮ মার্চ) রাত ১০টার দিকেও এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে, নগরের প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারে পা ফেলার ফুরসত ছিল না। মানুষের স্রোতে অচল হয়ে পড়ে যানবাহন চলাচল।
সিলেট নগরের অভিজাত শপিং মলখ্যাত জিন্দাবাজার এলাকার আল হামরা, ব্লুওয়াটার শপিং সিটি, সিটি সেন্টার, মানরু শপিং সিটি, কাকলী শপিং সেন্টার, সিলেট প্লাজা, জেল রোড, বারুতখানা ও কুমারপাড়ায় ফ্যাশন হাউসগুলোর শো-রুমে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা কেনাকাটা করছেন। পাশাপাশি বন্দরবাজার ও হকার্স মার্কেটেও নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। এছাড়া কুমারপাড়া ও নয়া সড়কের ফ্যাশন হাউস এবং শো-রুমে অভিজাত উচ্চবিত্তরা কেনাকাটা করেন। এবারও সেটি লক্ষ্য করা গেছে।
নগরের জিন্দাবাজার, বন্দরবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দেখা যায়, পোশাক, জুতা, কসমেটিকসসহ নানা পণ্যের দোকানে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। বিক্রেতারা জানান, গত কয়েক দিনের তুলনায় এখন ক্রেতার চাপ অনেক বেশি। সড়কেও দেখা গেছে তীব্র যানজট। রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির ভিড়ে চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে যানজটে আটকে পড়ছেন। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।
ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের আগে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেকে পরিবার-পরিজনের জন্য পোশাক কিনতে এসেছেন, আবার কেউ কেউ ঈদের উপহার সংগ্রহ করতে এসে হিমশিম খাচ্ছেন।
নগরের জিন্দাবাজার আলহামরা বিপণি বিতানের রিপন আহমদ বলেন, ‘রমজানের শুরুতে ক্রেতা সমাগম কম ছিল। শেষ দশ দিনে ক্রেতা বেড়েছে। এবার ঈদবাজারে মানুষজনের বাজেট অনেক কম। ধারণা হিসেবে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। কেননা, ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি সিলেটের অনেক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যেও থাকেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীরা হয়তো স্বজনদের জন্য সীমিত টাকা পাঠিয়েছেন। তাই ক্রেতারা সীমিত বাজেটের মধ্যে কেনাকাটা সারছেন।’
কেনাকাটা করতে আসা নিশাত রহমান বলেন, ‘এবার ঈদে কোনো ট্রেন্ডিং পোশাক আসেনি। গতানুগতিক কাপড়েও দাম বেশি। তাই সাধ্যের মধ্যে ঈদের কেনাকাটা সেরেছি।’
শহরতলীর এয়ারপোর্ট কাকুর পাড় এলাকার সুহেল আহমদ বলেন, ‘এবার ঈদ বাজারে কাপড়ের গুণগত মান তেমন ভালো মনে হয়নি। নামীদামি ব্র্যান্ডের ফ্যাশন হাউসগুলোতেও একই অবস্থা। দোকানিরা পুরোনো কালেকশন নতুন করে চালিয়ে দিচ্ছেন। দামও বাড়িয়েছেন।’
সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব আবদুর রহমান রিপন বলেন, ‘সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা। এ অঞ্চলের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। যুদ্ধের কারণে তাদের পরিবারের সদস্যরা এখন আতঙ্কগ্রস্ত। বেশিরভাগ ক্রেতার বাজেট সীমিত দেখা গেছে। যুদ্ধের কারণে কর্মহীন মানুষ দেশে টাকা পাঠাতে পারেননি। তাই এ অঞ্চলের মানুষের বেশিরভাগের কেনাকাটায় বাজেট সীমিত। যারা ইউরোপ-আমেরিকায় থাকেন, তাদের অনেকে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক দেশে এসে ফিরে গেছেন। ফলে ঈদকেন্দ্রিক স্বজনদের কেনাকাটায় আর্থিকভাবে কম সামিল হতে পেরেছেন। এরপরও গত ২/৩ দিন ব্যবসা ভালো হতো, কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির কারণে ম্লান হয়ে গেছে।’
অবশ্য বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া রমজান মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো কেটেছে। শেষ সময়ে একবাক্যে বলা যায়, মানুষ উৎসব আমেজে কেনাকাটা করছেন।’




